ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ-ইইউ কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ

বাংলাদেশ-ইইউ কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ
×

 কূটনৈতিক প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি বা পার্টনারশিপ কোঅপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (পিসিএ) প্রাথমিক চুক্তি সই হয়েছে। গতকাল সোমবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিস সদরদপ্তরে এ চুক্তি সই হয়। এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশ ও ইইউ কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। 

গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে জানানো হয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গতকাল ব্রাসেলস সফর করেন। এতে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। সফরকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কালাসের উপস্থিতিতে পিসিএ সই হয়। চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) মো. নজরুল ইসলাম এবং ইইউর পক্ষে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক) পাওলা পাম্পালনি সই করেন। খলিলুর রহমান এবং কায়া কালাস পিসিএর সইকে স্বাগত জানান ও তারা এ চুক্তিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি ভবিষ্যৎমুখী রূপরেখা হিসেবে উল্লেখ করেন। চুক্তিটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা খাতে বাংলাদেশ-ইইউ কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন। এ চুক্তি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অভিন্ন স্বার্থের বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ-ইইউ পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করবে বলে তারা মতপ্রকাশ করেন।
পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ প্রতিনিধি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইইউর ভাইস প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক অগ্রগতি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের চলমান সংস্কার, পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশে ইইউর একটি শক্তিশালী নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর জন্য কায়া কালাসকে ধন্যবাদ জানান। কায়া কালাস একটি সফল ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, অভিবাসন, রোহিঙ্গা সমস্যাসহ সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাজার প্রবেশাধিকারসহ বাংলাদেশের অন্যান্য অগ্রাধিকার তুলে ধরেন এবং ইইউর সঙ্গে আরও শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করেন। তিনি দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি (আইপিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগ্রহও ব্যক্ত করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা মানবিক কার্যক্রমে ইইউর সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং এ দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য ইইউর অব্যাহত সম্পৃক্ততা কামনা করেন।
২০০১ সালে ইইউর সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি সই করে বাংলাদেশ, যা ছিল মূলত উন্নয়ন সহযোগিতাকেন্দ্রিক। এ চুক্তিতে অর্থনীতি, উন্নয়ন, সুশাসন ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিবর্তনের কারণে এবার সেই সহযোগিতাকে এক ধাপ উন্নীত করে রাজনৈতিক অংশীদারিত্বে উত্তরণে গিয়েছে দুই পক্ষ। দীর্ঘ দুই বছর দরকষাকষির মাধ্যমে চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে সম্পর্কের পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্যে বিগত আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর ইইউ-বাংলাদেশ পিসিএ নিয়ে আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়।

বেলজিয়ামের উপপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক
ইইউর সঙ্গে বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলজিয়ামের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র, ইউরোপীয়বিষয়ক এবং উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এ সময়ে উভয় মন্ত্রী বাংলাদেশ-বেলজিয়ামের কূটনৈতিক সম্পর্ক পর্যালোচনার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, উদ্ভাবন এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও সুসংহত করার বিষয়ে আশা প্রকাশ করেন। উভয় পক্ষ এ বছরের শেষে ব্রাসেলসে তৃতীয় বাংলাদেশ-বেলজিয়াম দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনাসহ যেসব ক্ষেত্রে বেলজিয়ামের দক্ষতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে বেলজিয়ামের আরও সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানান। উভয় পক্ষ অভিবাসন, ভিসা ও কনস্যুলার এবং রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়েও মতবিনিময় করে। বৈঠকে উভয় পক্ষ দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বহুপক্ষীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধির জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করবে বলে আশা ব্যক্ত করে।

ইউরোপীয় স্টার্টআপ, গবেষণা ও উদ্ভাবনবিষয়ক কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক
একই দিনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউরোপীয় কমিশনের স্টার্টআপ, গবেষণা ও উদ্ভাবনবিষয়ক কমিশনার একাতেরিনা জাহারিয়েভার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ইইউ সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় হরিজোন ইউরোপ কর্মসূচির আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নসহ সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহযোগিতা প্রদানের জন্য অনুরোধ জানান তিনি।
এক দিনের এ সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি নাহিদা সোবহান এবং বেলজিয়ামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও ইইউ মিশনের প্রধান খন্দকার মাসুদুল আলম উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

×