পুষ্প
এলাংজানির কূলে কালো ধুতরা
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে দেখা কালো ধুতরা গাছ। সম্প্রতি তোলা লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
চৈত্রের শেষ সকাল। চলেছি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলা থেকে এলাচিপুর গ্রামের দিকে। ফুরফুরে হাওয়া বইছে। সকালের সোনা রোদ আছড়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেতের ওপর। মাইলের পর মাইল সবুজের গালিচা, শেষ প্রান্তে অস্পষ্ট রেখায় আঁকা গ্রামের ছবি, গাছপালা। রাস্তার কোলের ডোবায় ফুটেছে জলজ আগাছা কচুরিপানা ও বিষকাটালির ফুল। মাঝে মাঝে ঝোপঝাড়কে লতিয়ে ঢেকে ফেলেছে আসাম লতাগুলো। ঘাসের বুক ফুঁড়ে মেরুন পতাকার মতো উড়ছে ঘেট কচুর ফুল। কিছুক্ষণ পর গাড়ি গিয়ে থামল এলাচিপুর গ্রামে।
এলাংজানি নদীতীরের সে জায়গাটা চমৎকার। দুইপার উঁচু তার, বালুকাময়, কাশবনে ছাওয়া। তিরতির করে কাঁপছে নদীর বহমান স্বচ্ছ নীলাভ-সবুজ জল। সে নদীর পারে হঠাৎ চোখ পড়ল একটা বিশাল কালো ধুতরা গাছের। ভেরীর মতো বেশ কয়েকটা ফুল ফুটেছে। ফুলগুলো বেশ বড়, গাছটাও বেশ তাগড়াই, কাঁটাওয়ালা গোল গোল ফলও ধরেছে।
সেই সুন্দর দৃশ্যের ছবি তুলতে তুলতে ভাবছিলাম, ফুলটা দেখতে যতই সুন্দর হোক ও গাছের সর্বাঙ্গ বিষে ভরা। এ গাছের বিভিন্ন অংশে রয়েছে বিপজ্জনক মাত্রায় ট্রপেন উপক্ষার নামক বিষ। এই বিষের বিষক্রিয়ায় মানুষ ও পশুপাখির মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। ধুতরার ফুলসহ বিভিন্ন অংশের নির্যাস থেকে তৈরি হয় স্কোপোলামিন নামক চেতনানাশক ড্রাগ, যা মানুষের চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অবশ্য শ্বাসকষ্ট কমানোর জন্যও এ গাছের পাতা, ফুল, ফল ব্যবহার করা হয়।
চীনে গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি ঔষধি গাছের একটি হলো কালো ধুতরা। তার পরও বিষাক্ততার কারণে অনেক দেশে কালো ধুতরা উৎপাদন, বিপণন ও বহন আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ধুতরা কয়েক রকমের। বেগুন গোত্রের তথা সোলানেসি পরিবারের Datura গণের গাছ। সারা পৃথিবীতে এ গণে ৯টি প্রজাতি রয়েছে। কালো ধুতরার প্রজাতি Datura metel, আর সাদা ধুতরার প্রজাতি Datura wrightii।
এর গণগত নামটি গ্রহণ করা হয়েছে সংস্কৃত শব্দ ধাতুরা থেকে, যার অর্থ ‘ঐশ্বরিক মদ্যপান’। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে ধুতরা পবিত্র গাছ, শিবপূজায় লাগে। প্রাচীন আয়ুর্বেদগ্রন্থ সুশ্রুত সংহিতায় কয়েক প্রকার ধুতরার উল্লেখ আছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও ধুতরার নামকরণের পেছনে রয়েছে এক মজার গল্প। যুক্তরাষ্ট্রে ধুতরার নাম জিমসন উইড। ধারণা করা হয়, ১৬০৭ সালের দিকে ক্যাপ্টেন জন স্মিথ ও তাঁর সহযোগীরা ভার্জিনিয়ার জেমসটাইন নামক স্থানে একটি উপনিবেশ স্থাপনের সর্বশেষ প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেখানে ব্রিটিশ সৈন্যদের সালাদে সেদ্ধ জেমসটাউন উইড দেওয়া হয়েছিল। সৈন্যরা তা খাওয়ার পর কয়েক দিন বেশ উল্টাপাল্টা আচরণ দেখিয়ে ছিল। সালাদে ব্যবহৃত সে গাছটি ছিল ধুতরাগাছ। সেখান থেকেই গাছটির নাম হয় জেমসটাউন উইড, যা অপভ্রংশে দাঁড়ায় জিমসন উইড।
কালো ধুতরা একটি বর্ষজীবী বা স্বল্পজীবী বহুবর্ষজীবী বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। গাছ দেড় মিটার পর্যন্ত লম্ব হয়। কাণ্ড ফাঁপা, কালচে বেগুনি বাকল, প্রচুর শাখায়িত ও ঝোপাল। বয়স্ক শাখা অনেক সময় কাষ্ঠল হয়। ডালপালা ও পাতায় তীব্র গন্ধ আছে। ডগা কিছুটা রোমশ ও গাঢ় বেগুনি। ভেরি বা মাইকের চোঙের মতো ফুল, ফুলের পাপড়ি যুক্ত, ভেতরের দিকের রং সাদা, বাইরের দিকের রং বেগুনি, সুগন্ধি ও রাতে ফুল ফোটে। ফল গোলাকার, কণ্টকিত, সবুজ, কাঁটাগুলো বেগুনি-কালো। ফল পাকলে চার খণ্ডে ভাগ হয়ে ফেটে বীজগুলো ছড়িয়ে পড়ে। বীজ থেকে চারা হয়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- পুষ্পা
