উৎসব
কলাকেন্দ্রে ছাপচিত্রে বহুরৈখিক ভাষ্য
রঙের নীরব দরজায় সময়ের পদচারণা
রাজধানীর লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে গত শুক্রবার শুরু হয়েছে মাসব্যাপী ছাপচিত্র উৎসব। কলাকেন্দ্র ও কিবরিয়া প্রিন্টমেকিং স্টুডিও যৌথভাবে আয়োজন করেছে এ উৎসব কলাকেন্দ্র
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৮:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সবুজ দরজার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া এক চিলতে হলুদ আলো, যেন অদৃশ্য কোনো ভেতর ঘরের আহ্বান। এর পাশে বসে থাকা নীরব ছায়া, সময়ের মতো স্থির। আরেক ফ্রেমে নীলের গভীরতায় ভেঙে যাওয়া মানব-আকৃতি, যেন স্মৃতির ভেতর থেকে নিজেকে পুনর্গঠন করছে। কোথাও-বা হলুদের বিস্তীর্ণ জমিনে দাঁড়িয়ে থাকা বিমূর্ত বৃক্ষরেখা, যেন নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। শিল্পী রফিকুন নবীর এসব ছাপচিত্র যেন দৃশ্য নয়, অনুভূতির দরজা। যেখানে প্রবেশ করলেই দর্শক নিজের ভেতরের অচেনা ভূগোলের মুখোমুখি হয়ে যায়। আর ঠিক এমন এক নীরব, গভীর শিল্পভাষার মধ্য দিয়েই গত শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে কলাকেন্দ্রে মাসব্যাপী ছাপচিত্র উৎসব।
ঢাকার লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্র ও কিবরিয়া প্রিন্টমেকিং স্টুডিওর আয়োজনে এই উৎসবের উদ্বোধন হয় বিকেল ৫টায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন– ইমেরিটাস অধ্যাপক শিল্পী রফিকুন নবী ও শিল্পী মনিরুল ইসলাম। তাদের উপস্থিতি যেন এই আয়োজনকে শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, বাংলাদেশের ছাপচিত্র ঐতিহ্যের জীবন্ত ধারাবাহিকতায় রূপ দিয়েছে।
উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘ছাপাই ছবির পথিকৃৎ’ শিরোনামের প্রদর্শনী। যেখানে স্থান পেয়েছে চারজন প্রখ্যাত শিল্পী– সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, রফিকুন নবী ও মনিরুল ইসলামের কাজ। প্রদর্শনীটি বাংলাদেশের ছাপচিত্রের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কারণ এখানে উপস্থাপিত অধিকাংশ কাজই শিল্পীদের সৃষ্টিশীল জীবনের প্রারম্ভিক সময়ের। তাদের হাত ধরেই এ দেশে ছাপচিত্র একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রদর্শনীটি চলবে আগামী ২৩ মে পর্যন্ত, প্রতিদিন বিকেল ৪টায় শুরু হয়ে শেষ হবে রাত ৮টায়।
প্রদর্শনীতে রফিকুন নবীর কাজগুলো আলাদা করে চোখে পড়ে তাদের নীরব অথচ তীব্র অভিব্যক্তির জন্য। তাঁর ছবিতে সরাসরি কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু প্রতিটি রেখা ও রঙের স্তর যেন জমে থাকা অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত বহন করে। সবুজ দরজার প্রতীকী ব্যবহার, ভাঙা গঠনের মানব-অবয়ব, কিংবা হলুদের একরৈখিক বিস্তার। সবকিছু মিলিয়ে তাঁর শিল্পভাষা একদিকে যেমন আত্মজৈবনিক, অন্যদিকে সামাজিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। তাঁর কাজ দর্শককে শুধু দেখায় না, বরং ভাবতে বাধ্য করে। অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা, সময়ের ক্ষয় এবং অস্তিত্বের ভঙ্গুরতা নিয়ে।
উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ১৪তম কিবরিয়া ছাপচিত্র মেলা। যা চলবে আগামী ৯ মে পর্যন্ত। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ ১৪ প্রতিষ্ঠান এতে অংশগ্রহণ করছে। এ মেলা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। শুধু দেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এটি আন্তর্জাতিক পরিসরেও একটি সংযোগ তৈরি করেছে। মেলার মূল উদ্দেশ্য হলো ছাপচিত্রকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং এই মাধ্যমের সামাজিক ও নান্দনিক গুরুত্বকে তুলে ধরা। পাশাপাশি সুলভ মূল্যে শিল্পকর্ম সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হওয়ায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও শিল্পসংগ্রহের আগ্রহ বাড়ছে। এছাড়া উৎসবজুড়ে রয়েছে ছাপচিত্র বিষয়ক কর্মশালা এবং শিল্পী-আলাপ, যা নতুন ও আগ্রহী শিল্পীর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক পরিসর তৈরি করছে।
উৎসবের শেষ পর্বে, ১২ মে থেকে ২৩ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে ‘সমকালীন ছাপচিত্র প্রদর্শনী’। যেখানে নবীন-প্রবীণ শিল্পীদের কাজ একত্রে উপস্থাপিত হবে। এই প্রদর্শনী বর্তমান সময়ের ছাপচিত্র চর্চার বহুমাত্রিকতা তুলে ধরবে। একই সঙ্গে ভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীদের ভাবনা, কৌশল, অভিব্যক্তির পার্থক্য ও মিল খুঁজে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
- বিষয় :
- উৎসব পালন
