ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

বাপাসহ তিন সংগঠনের সংবাদ সম্মেলন

হাওরের চলমান সংকট মানবসৃষ্ট জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে

হাওরের চলমান সংকট মানবসৃষ্ট জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে
×

ছবি-সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ০৬:১৮

হাওরাঞ্চলের বন্যা ও ফসলহানিকে বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে এর বড় অংশই মানবসৃষ্ট। এমন অভিযোগ তুলেছেন পরিবেশবিদ, গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ, নদীর নাব্য কমে যাওয়া, জলাধার দখল এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে হাওরের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলেই আগাম বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে, যা ফসলহানিকে তীব্রতর করছে। এই সংকট এখন জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘হাওর অঞ্চলে চলমান বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ফসলহানি, দুর্যোগ পরিস্থিতি এবং হাওরবাসীর দাবি’ শীর্ষক এই সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা এবং নাগরিক উদ্যোগ।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, হাওরের সমস্যাকে দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সড়ক ও বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, ফলে আগাম বন্যা এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনে এসব অবকাঠামো অপসারণ করে হাওরের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

তিনি বলেন, জলাধার ইজারা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা লিজ বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অথচ তাদের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেই। হাওর বোর্ডের প্রস্তুতির ঘাটতির কথাও তুলে ধরে শামসুল হুদা বলেন, প্রতিবছর একই ধরনের বিপর্যয় ঘটলেও আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয় না। 
সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলাকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্যার সময় ধান কাটতে নৌকার অভাব, কৃষি শ্রমিক সংকট এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে কৃষকের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। ফসলহানির প্রভাব শুধু কৃষিজমিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি কৃষকের জীবিকা, ঋণ পরিশোধ, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। 

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, হাওর রক্ষার নামে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এই দুর্নীতি বন্ধ না হলে হাওর রক্ষা সম্ভব নয়।

তিনি হাওরের বাস্তুতন্ত্র বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, পানি প্রবাহ অবাধ রাখা এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা জানান, চলতি বোরো মৌসুমে মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত টানা তিন দফা বৃষ্টিপাত এবং ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে অন্তত ৭৫ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। শিলাবৃষ্টিতে আরও প্রায় ৮০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অব্যাহত বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে। 

সংকট মোকাবিলায় তিনি ১৫ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে– ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে বছরব্যাপী সহায়তা প্রদান, নদী-খাল ও বিল খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা, অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করা, ফসল রক্ষা বাঁধে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ।
এ ছাড়া কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ, সুদমুক্ত ঋণ ও ঋণ পুনঃতপশিল, কমিউনিটি মাড়াই কেন্দ্র ও ড্রায়ার স্থাপন, বজ্রপাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা, জলমহালের ইজারা বাতিল, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জলবায়ু তহবিল থেকে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, এবারের সংকট কেবল প্রাকৃতিক নয়; এটি নীতিগত, পরিকল্পনাগত ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার ফল। নদীর নাব্য কমে যাওয়া, দেরিতে বাঁধ নির্মাণ এবং অনিয়ম-দুর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

লেখক ও গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এটি যেন কোনোভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট না হয়। এই ফসলহানির ফলে বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া এবং নানা সামাজিক সংকট দেখা দিতে পারে। বর্গা চাষিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অনেক সময় তারা সহায়তা তালিকার বাইরে থেকে যান।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর স্থানীয় সরকার না থাকাও সংকট মোকাবিলায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সক্রিয় করার ওপর জোর দেন এই গবেষক।

বাপার কোষাধ্যক্ষ আমিনূর রসুল বলেন, কোরবানির পশুর একটি বড় অংশ হাওর অঞ্চল থেকে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যায় খাদ্য ও আশ্রয়ের অভাবে কৃষকরা কম দামে গবাদি পশু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জলবায়ু তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
 

আরও পড়ুন

×