দুর্লভ উদ্ভিদ
পাহাড়ি ফুল পালাম
বৈশাখে রমনা উদ্যানে ফুটেছে পাহাড়ি পালাম ফুল -লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৮:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূল ছিল লোকে লোকারণ্য, এখন শূন্য। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই যেন প্রাঙ্গণে ফুটতে শুরু করেছে বৈশাখের ফুল পালাম। প্রাঙ্গণের সামনের প্রান্তে সারি করে লাগানো কয়েকটা পালাম গাছে ফুল ফোটা শুরু হয়েছে। এ মাস ধরেই ফুটতে থাকবে। তাই বুনো পাহাড়ি ফুলের সৌন্দর্যকে নগরবাসী চাইলে রমনা উদ্যানের সেই প্রাঙ্গণে গিয়ে উপভোগ করতে পারবেন।
পালাম মৌলভীবাজারের পার্বত্য অরণ্যের গাছ। সেখান থেকে নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা এনে লাগিয়েছিলেন রমনা উদ্যানের নার্সারির ভেতরে। সেই গাছ এখন বড় হয়ে ফুল দিয়ে যাচ্ছে। বটমূল প্রাঙ্গণের গাছগুলো নবীন। স্থপতি তুঘলক আজাদ জানালেন, ২০১৮ সালে পাঁচ সারির প্রায় ৫০টি মেহগনি গাছ সরিয়ে ৫০টি পালাম গাছ লাগানো হয়। বেশ কিছু গাছ মারা যায়। ২০২১ সালে আবার কিছু গাছ লাগানো হয়। সেগুলো তিনি নিজে বীজ থেকে চারা তৈরি করে লাগিয়েছিলেন।
পরিকল্পনা ছিল, পহেলা বৈশাখে যেহেতু নববর্ষের গানের আসর বসে, প্রচুর লোকসমাগম হয়, সে জন্য পহেলা বৈশাখে ফুল ফোটে এমন গাছ লাগানো। সে হিসেবে তারা সেখানে লাগিয়েছিলেন পালাম ও কুরচি। দুটি গাছেই ফুল ফুটতে শুরু করেছে। কুরচি ফুলগাছগুলোর কাছে গেলে তার সুগন্ধে মন ভরে যায়।
পালামের অন্য নাম পালান, পাল্লান ও দুধকরবী। এর ডাল ভাঙলে সাদা দুধের মতো আঠালো কষ ঝরে। পালামের ইংরেজি নাম স্কারলেট রাইটিয়া। রাইটিয়া গণের এ গাছটির উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Wrightia coccinea, গোত্র অ্যাপোসাইনেসি। গণগত নামটি জনৈক স্কটিশ চিকিৎসক ও উদ্ভিদবিদ উইলিয়াম রাইটের নামের স্মারণিক।
রাইটিয়া গণে বিশ্বে ৩৪টি প্রজাতি রয়েছে; বাংলাদেশে নথিভুক্ত আছে তিনটি প্রজাতি– পালাম, দুধকুরুশ ও নীলকরবী। রাইটিয়া গণের আরও দুটি আলংকারিক উদ্ভিদ পার্সিয়ান জুঁই ও শ্বেতদুতী গাছ সম্প্রতি এ দেশে এসেছে।
পালাম গাছ একটি পত্রঝরা প্রকৃতির গুল্ম বা বৃক্ষ, যা প্রায় ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছের বাকল ধূসর থেকে বাদামি, মসৃণ। পাতার বোঁটা খাটো, পাতা উপবৃত্তাকার থেকে ডিম্বাকার, আগা সুচালো, দৈর্ঘ্য ৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার, সবুজ, পশমবিহীন। তবে নিচের পিঠে শিরার সঙ্গে কিছু পশম বা রোঁয়া থাকতে পারে। পত্রফলকের মধ্যশিরা থেকে দুপাশে ৮ থেকে ১৪ জোড়া পার্শ্বশিরা থাকে। ফুল ফানেল আকৃতির, পাপড়ি থাকে পাঁচটি, সিঁদুরে লাল রং। বসন্তের শেষ বা গ্রীষ্মের শুরু থেকে পালামের ফুল ফোটে, মে মাস পর্যন্ত ফুল ফুটতে থাকে। ফুল শেষে লম্বা বেলনের মতো ফল হয়। ফল পাকলে বাদামি হয়ে খোসা ফেটে রেশমের আঁশের মতো পালকযুক্ত বীজ ছড়িয়ে পড়ে এবং বাতাসে ভেসে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়। বীজ দ্বারা বংশবৃদ্ধি ঘটে।
এ গাছের আদি নিবাস পূর্ব এশিয়া থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম চীন। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও উত্তর-পূর্ব ভারতে এ গাছ রয়েছে। এ দেশে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ে আছে। প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিটার উঁচু পর্যন্ত পাহাড়ে এ গাছ জন্মাতে পারে।
পালাম এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি গাছ। এ গাছের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, সাইটো-টঙ্কি, অ্যান্টি-ডায়রিয়াল, হাইপোগ্লাইসেমিক ও অ্যানালজেসিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ব্যথা-বেদনা ও প্রদাহ উপশমে এবং চর্মরোগের চিকিৎসায় এ গাছের লোকায়ত ব্যবহার রয়েছে। আইইউসিএনের মূল্যায়নে পালাম বিপন্নতার ঝুঁকিতে রয়েছে। সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- ফুল
