নৌপথে অপরাধ বেড়েছে ৬৩%
বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৮:৫৫ | আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ | ১১:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
অন্ধকার নামলেই নদীপথে নামে আতঙ্ক। যাত্রীবাহী ট্রলার, জেলে নৌকা, মালবাহী কার্গো, বাল্কহেডসহ নানা নৌযানে হামলা, ডাকাতি, মাদক পাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজির মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। স্থলপথের চেয়ে নৌপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কম থাকায় অপরাধীরা এ পথকে বেছে নিচ্ছে। ফলে বাড়ছে নদীকেন্দ্রিক অপরাধ।
এ ছাড়া খুনিরা অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলা ও নিজেদের আড়াল করার চেষ্টায় লাশ নদীতে ফেলছে। পানির স্রোতে লাশ ভেসে চলে যাওয়ার কারণে নদীকে লাশ গুমের ‘নিরাপদ স্থান’ মনে করা হয়। লাশ পচে-গলে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তও কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্ষা মৌসুমে ছয় থেকে আট হাজার কিলোমিটার নৌপথ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে তা কমে দাঁড়ায় তিন থেকে চার হাজার কিলোমিটারে। এর মধ্যে নিয়মিত নৌযান চলাচল করে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার নৌপথে। এই বিশাল জলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নৌ পুলিশের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
নৌ পুলিশ সদরদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জলপথকে ১১টি অঞ্চলে ভাগ করে আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম চালাচ্ছে নৌ পুলিশ। এসব অঞ্চলে খুন, অপমৃত্যু, ডাকাতি, ছিনতাই, অস্ত্র, চোরাই পণ্য বহন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদকসহ নানা অপরাধে ২০২৪ সালে দুই হাজার ৮৫টি মামলা হয়। তবে পরের বছর অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় মামলার সংখ্যাও বাড়ে। ২০২৫ সালে মামলা হয় তিন হাজার ৩৯৯টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মামলা বাড়ে এক হাজার ৩১৪টি, যা ৬৩ শতাংশ।
অঞ্চলভিত্তিক অপরাধের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ঢাকা অঞ্চলে ১২০টি, নারায়ণগঞ্জে ১০৬, চট্টগ্রামে ১৮২, চাঁদপুরে ৮৫০, বরিশালে ৪৪৮, ফরিদপুরে ১১৩, কিশোরগঞ্জে ৪৯, রাজশাহী ৯০, টাঙ্গাইলে ৩৫, খুলনায় ৩৪ এবং সিলেটে ৫৮টি মামলা হয়। ২০২৫ সালে ঢাকা অঞ্চলে ১২৮টি, নারায়ণগঞ্জে ৯১, চট্টগ্রামে ১১৮, চাঁদপুরে দুই হাজার ১৭, বরিশালে ৬১১, ফরিদপুরে ১৪৭, কিশোরগঞ্জে ৩০, রাজশাহী ১২১, টাঙ্গাইলে ৬৬, খুলনায় ২৫ এবং সিলেটে ৪৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বেশি অপরাধ বেড়েছে চাঁদপুর অঞ্চলে। আগের বছরে যেখানে মামলা ছিল ৮৫০টি, পরের বছর তা বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ১৭টি।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে নৌ পুলিশের বিভিন্ন থানায় মোট মামলা হয়েছে ৯ হাজার ৯৩৭টি। এর মধ্যে আট হাজার ৯৯৯টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় গত দুই বছরে এক হাজার ৭৫১টি মামলার রায় হয়েছে, যার মধ্যে এক হাজার ৬৭১ মামলার আসামিদের সাজা দেন আদালত।
নৌ পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশনস) প্রবীর কুমার রায় সমকালকে বলেন, নৌপথে আমাদের নজরদারি জোরদার রয়েছে। টহল ডিউটি ও চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহজনক নৌযান ও ব্যক্তি তল্লাশি কার্যক্রম অব্যাহত আছে। নৌপথে যাতে কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত না হয় সে ব্যাপারে তৎপর আছি।
পাঁচ বছরে ৬৩৯ লাশের পরিচয় মেলেনি
নদী থেকে লাশ উদ্ধার ও এ বিষয়ক মামলা তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দিলে তা দ্রুত পচন ধরে ও চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। যেখানে মরদেহ ফেলা হয়, সেখান থেকে লাশ চলে যায় অনেক দূরে। গলিত অবস্থায় লাশ পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে হত্যাকাণ্ডের আলামত নষ্ট করা ও আইনের ফাঁকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ পায় অপরাধীরা। এ কারণে অপরাধীরা লাশ গুম করতে নদীকে তুলনামূলক ‘নিরাপদ’ মাধ্যম বিবেচনা করে।
গত ১৭ মার্চ ঢাকার আব্দুল্লাহপুর এলাকার তুরাগ নদ থেকে অচেনা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ পচে-গলে যাওয়ায় ফিঙ্গার পরীক্ষা করেও তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। টঙ্গী নৌ ফাঁড়ির এসআই কাজী নিয়াজ বলেন, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য লাশ ময়নাতদন্ত করা হয়েছে।
নৌ পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছরে নদী থেকে দুই হাজার ৬৪টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হয়েছে এক হাজার ৪২৫টির। পচে-গলে যাওয়ায় ৬৩৯টি লাশের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
পাঁচ বছরে জলপথে ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এ ছাড়া গুলি, রামদা, চায়নিজ কুড়ালসহ দেশি বিভিন্ন অস্ত্র জব্দ করা হয়। তিন বছরে গ্রেপ্তারের একটি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ১০ হাজার ৪৭ জন, ২০২৪ সালে ১১ হাজার ৫২৭ জন এবং গত বছর সাত হাজার ৮১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
খুনের পর লাশ ফেলা হয় নদীতে
হত্যার পর নৌপথ ব্যবহার করে কীভাবে অপরাধীরা প্রমাণ গোপন করে, এর উদাহরণ মেলে ঢাকার ধামরাইয়ের বংশী নদীতে পাওয়া অটোরিকশাচালক হুমায়ুন কবির হত্যায়।
গত ২ নভেম্বর দুপুরে সাভার নামাবাজার বাঁশপট্টিসংলগ্ন বংশী নদী থেকে ভাসমান যুবকের লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। পরে জানা যায়, তিনি ধামরাইয়ের আমরাইল গ্রামের বাসিন্দা হুমায়ুন কবির।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ২৮ অক্টোবর অটোরিকশা নিয়ে বের হয়ে আর বাসায় ফেরেনিন হুমায়ুন। সন্ধান না পেয়ে ছোট ভাই মো. মোশারফ বাদী হয়ে ধামরাই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নিখোঁজের পাঁচ দিন পর বংশী নদী থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ প্রথমে লাশটি অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। পরে জিডির সূত্র ধরে নৌ পুলিশ বাদী মোশারফকে খবর দিলে তিনি ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন।
মোশারফ সমকালকে বলেন, মুখ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ভাইকে চেনা যাচ্ছিল না। তবে হাতে থাকা আংটি, কোমরে বেল্ট, জিন্স প্যান্টসহ কিছু জিনিস দেখে চিনতে পারি।
তিনি জানান, এ ঘটনায় নৌ পুলিশের আমিনবাজার থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। কিন্তু এখনও হুমায়ুনের রিকশাটি পাওয়া যায়নি। পরিবারের দাবি, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই হুমায়ুনকে হত্যা করে তাঁর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
গত ২১ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার মেঘনা নদী থেকে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁর পকেটে থাকা ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে পরিচয় শনাক্ত হয়।
২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাইমচরে মেঘনা নদীতে সারবাহী জাহাজ এমভি আল-বাখেরার সাত কর্মচারীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মল্লিক সমকালকে বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ বিভিন্ন নদীপথে নৌযান চাঁদাবাজ, ডাকাত দলের কবলে পড়ে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে নদীপথে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়।
তিনি আরও বলেন, পদ্মা নদীর মাওয়া থেকে শুরু করে জাজিরার মাঝিকান্দী, ভেদরগঞ্জের কাচিকাটা, চাঁদপুরের লক্ষ্মীচরের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল এলাকায় কয়েকটি চাঁদাবাজ গ্রুপ ও আন্তঃজেলা ডাকাত দলের তৎপরতা রয়েছে। এ ছাড়া মেঘনা নদীর হাইমচরের চরভৈরবী, শরীয়তপুরের ইসানবালা, বরিশালের হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা নদীতে চাঁদাবাজ ও আন্তঃজেলা ডাকাত দলের আনাগোনা আছে। এসব এলাকায় চলাচল করা নৌযানের চালক ও যাত্রীরা সন্ধ্যার পর থেকে আতঙ্কে থাকেন।
