বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স শেষ
গণতন্ত্র সংকুচিত হলে গণমাধ্যম চাপে পড়ে
বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আইন বিশেষজ্ঞ জন বারাটা, বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার, টাইমস মিডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ, ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ ও প্রথম আলোর ইংরেজি বিভাগের প্রধান আয়েশা কবির-সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১৪:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি দেশের সামগ্রিক রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গণতন্ত্র, জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার যত বেশি সংকুচিত হবে, গণমাধ্যম তত বেশি চাপে পড়বে।
বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬-এর শেষ দিন গতকাল শনিবার টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ কথা বলেন।
রাজধানীর একটি হোটেলে দুই দিনের এ সম্মেলনের আয়োজক ছিল মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)। দেশি-বিদেশি ৫৪৭ সাংবাদিক, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এতে অংশ নেন।
‘রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত গণমাধ্যম’ শীর্ষক প্রথম অধিবেশনে মূল বক্তা ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। বক্তব্য দেন পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন-এর সম্পাদক জাফর আব্বাস, ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী ও বিবিসি বাংলার সাবেক সিনিয়র সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার। সঞ্চালনা করেন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন।
ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেন, বাংলাদেশের ‘প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’, দুর্নীতির ধারণা সূচক, সুশাসনের পরিস্থিতি নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছিল, তখন তাঁর মনে হচ্ছিল যেন পাকিস্তানের কথাই বলা হচ্ছে। সেখানে কোনো ভারতীয় সাংবাদিক থাকলেও হয়তো একই অনুভূতি প্রকাশ করতেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, রাজনৈতিক বিটে কাজ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রভাবের মধ্যে পড়ে যান। কেউ বিএনপির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিএনপির মতো চিন্তা করেন। কেউ আওয়ামী লীগের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সেই দলের দিকে ঝুঁকে যান। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও নিজেদের পছন্দের সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করার প্রবণতা বেশ শক্ত। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হচ্ছে পেশাদার সাংবাদিকতার চর্চা।
শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী কণ্ঠ তুলে ধরার বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসছে। সব সরকারের কৌশল থাকে বিরোধী দলের (সংসদে থাকা) কণ্ঠস্বরকে ছোট করে রাখার। আবার বর্তমান বিরোধী দলের অতীত ভূমিকা ও রাজনৈতিক আদর্শের কারণে গণমাধ্যমে বিরোধী কণ্ঠ হিসেবে যথাযথভাবে স্থান পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতি শেষ বিচারে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। এমন বাস্তবতায় রাজনীতিতে আরেকটি বড় দলের অনুপস্থিতি সরকারি দলকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করতে পারে এবং তাও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য নেতিবাচক হতে পারে।
প্রভাবশালীদের চাপে সংবাদ প্রকাশ আটকে যায়
দ্বিতীয় অধিবেশনের বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণ: পেশাগত তত্ত্বাবধান, জবাবদিহি ও অভিযোগ প্রতিকার’। এতে বক্তব্য দেন টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ. কে. আজাদ। বিবিসি বাংলার সাবেক সিনিয়র সাংবাদিক শাকিল আনোয়ারের সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য দেন গণমাধ্যম-সংক্রান্ত আইন বিশেষজ্ঞ ড. জোয়ান বারাতা, ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ ও প্রথম আলো ওয়েবের (ইংরেজি) টিম লিডার আয়েশা কবির।
অতীত অভিজ্ঞতা স্মরণ করে এ. কে. আজাদ বলেন, ‘যার বিরুদ্ধে সংবাদ হবে, প্রথম ফোনটাই আসে আমার কাছে; যেন কোনোভাবেই সংবাদটি প্রকাশ না করা হয়। এতে কাজ না হলে প্রভাবশালী মহল, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদেরও ব্যবহার করা হয়।’
সাংবাদিকরা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারার কয়েকটি কারণ তুলে ধরে এ. কে. আজাদ বলেন, দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের আগে সাংবাদিকদের সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিতে হয়। তখন থেকেই চাপ শুরু হয়।
অতীত অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘যার বিরুদ্ধে সংবাদ হবে, প্রথম ফোনটাই আসে আমার কাছে; যেন কোনোভাবেই সংবাদটি প্রকাশ না করা হয়। এতে কাজ না হলে প্রভাবশালী মহল, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদেরও ব্যবহার করা হয়।’

এ. কে. আজাদ বলেন, ফলে অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম মালিকদের ওপর এমন চাপ তৈরি হয়, যেখানে সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার আটকে দেওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে সংকট তৈরি হয়। সাংবাদিকরা জানান, যদি সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ না করা হয়, তাহলে তথ্যদাতা মনে করতে পারেন, কোনো বিনিময়ের মাধ্যমে সংবাদটি গোপন রাখা হয়েছে। এতে সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ. কে. আজাদ বলেন, যদি গণমাধ্যম মালিকদের জন্য এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় যেখানে হয়রানি, গ্রেপ্তার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রশাসনিক বাধার আশঙ্কা থাকবে না; তাহলে মালিকপক্ষও সাংবাদিকদের কাজের ওপর অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে না।
গণমাধ্যমের জবাবদিহি ও নিজস্ব নীতিমালার ওপর জোর দেন কামাল আহমেদ। তিনি পাঠকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে একজন ‘রিডার্স এডিটর’ নিয়োগের প্রস্তাব করেন।
যুদ্ধে প্রথম শিকার হয় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা
গতকাল বিকেলের এক আলোচনায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, যুদ্ধকালীন জাতীয়তাবাদ, আর্থিক চাপ এবং ডিজিটাল রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস। ‘স্পিকিং ট্রুথ টু পাওয়ার: আ স্টোরি অব ইনডিপেনডেন্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাই প্রথম শিকার হয়। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে কেউই এমন কিছু লিখতে চায় না, যা জাতীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে যায়। কামাল আহমেদের সঞ্চালনায় এ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যান্য অধিবেশন
দুপুরের পর আরও তিনটি অধিবেশন হয়। ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইন নিউজরুমস: ইনোভেশন, ইন্টিগ্রেশন অ্যান্ড এথিকস’ শীর্ষক অধিবেশনে সংবাদকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক, সাবেক নির্বাহী সম্পাদক মারডক ডেভিস ও ডেইলি স্টারের উপসম্পাদক অরুণ দেবনাথ।
‘বিহাইন্ড দ্য বাইলাইন’ শীর্ষক অধিবেশনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের নেপথ্য গল্প ও ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন এমআরডিআইর ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অ্যান্ড আইজে হেল্প ডেস্কের প্রধান বদরুদ্দোজা বাবু, সাংবাদিক আসাদুজ্জামান এবং ডেইলি স্টারের সিনিয়র রিপোর্টার জাইমা ইসলাম।
‘ফর দ্য রাইজ অব ইনডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম স্টার্টআপস’ শীর্ষক অধিবেশনে ডেইলি স্টারের ডিজিটাল সম্পাদক তানিম আহমেদের সঞ্চালনায় অংশ নেন জুলিয়ান শের, আশরাফুল হক এবং এস কে তানভীর মাহমুদ।
এমআরডিআইর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুর বিকেলে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
- বিষয় :
- গণমাধ্যম
- সাংবাদিকতা
