ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মব নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়নের কথা ভাবছে সরকার

পুলিশ সপ্তাহের আলোচনা

মব নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়নের কথা ভাবছে সরকার
×

 সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ০৬:৪৫ | আপডেট: ১১ মে ২০২৬ | ১৮:৫০

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাগচালা বাজার এলাকায় গতকাল রোববার ভোরে গরু চোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে গত ১ মার্চ রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মোটরসাইকেলের সঙ্গে প্রাইভেটকারের ধাক্কাকে কেন্দ্র করে এক শিক্ষানবিশ আইনজীবীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ রকম দলবদ্ধভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা মবের ঘটনা দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝেমধ্যেই ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব মোকাবিলায় দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অনেক ঘটনায় পুলিশ উপস্থিত থেকেও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সাহস দেখাতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে মব নিয়ন্ত্রণে আইন সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের কথা ভাবছে সরকার। 

গতকাল রোববার পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রচলিত আইন দিয়ে ‘মব’ পুরোপুরি মোকাবিলা সম্ভব হচ্ছে না। এ লক্ষ্যে আইন সংশোধন বা নতুন করে আইন করা প্রয়োজন হতে পারে।   

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রচলিত আইনের আওতায় যতটুকু সম্ভব, আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ বিষয়ে আইনি সংস্কার বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেটিও করা হবে।’  

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দেশব্যাপী মবের ঘটনা বেড়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে মবের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এর পরও বিভিন্ন স্থানে আইন হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে মবের ঘটনায় ৪৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১৪, খুলনায় ৫, রাজশাহীতে ৫, রংপুরে ৩, চট্টগ্রামে ৮, বরিশালে ৩ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৫ জন। 

এর আগে ২০২৫ সালে মবের ঘটনায় নিহত হন ১৯৮ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৮১ জন, খুলনায় ১৯, রাজশাহীতে ১৭, রংপুরে ১২, সিলেটে ৪, চট্টগ্রামে ৩৬, বরিশালে ১৬ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ১৩ জন। ২০২৪ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ১২৮। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৫৭ জন, খুলনায় ১৪, রাজশাহীতে ১৯, রংপুরে ৫, সিলেটে ৪, চট্টগ্রামে ১৭, বরিশালে ৭ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৫ জন। 

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য বলছে, গত ১০ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান সবচেয়ে ভীতিকর। ২০১টি গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭৯ জন; আহত ৮৮ জন। ২০১৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে গণপিটুনির ১০০৯টি ঘটনায় ৭৯২ জন নিহত ও ৭৬৫ জন আহত হন। তবে প্রকৃত গণপিটুনির ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করে সংস্থাটি।

বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে, অপরাধী-নিরপরাধ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আওতায় বিচার লাভ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩৩, ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সব নাগরিক আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী এবং আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না ও অপরাধের জন্য যতটুকু শাস্তি প্রাপ্য, তার চেয়ে বেশি বা ভিন্ন কোনো শাস্তি দেওয়া যাবে না। 

এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯ ধারা অনুযায়ী, অপরাধী ধরা পড়লে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতেই হবে। এর ব্যতিক্রম হলে দণ্ডবিধির ১৮৭, ৩১৯, ৩২৩, ৩৩৫ ও ৩০৪ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান আছে। গণপিটুনিতে কেউ নিহত হলে দণ্ডবিধির ৩৪ ধারা অনুযায়ী এতে অংশ নেওয়া সব ব্যক্তি সমানভাবে দায়ী হবে। 

মব বা গণপিটুনিতে কেউ জড়ালে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী শাস্তির বিধান রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বাংলাদেশে একটি গুরুতর অপরাধ। বেআইনি সমাবেশ ও দাঙ্গা দণ্ডবিধির ১৪৩-১৪৭ ধারায় অপরাধ। এতে ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ধারা ১৪৩-এ বলা আছে, যদি ৫ বা ততোধিক ব্যক্তি মিলে কোনো বেআইনি সমাবেশের সদস্য হয়, তবে তাদের সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। 

ধারা ১৪৪-এ বলা হয়েছে, মারাত্মক অস্ত্র বা এমন কিছু নিয়ে বেআইনি সমাবেশে যোগ দিলে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা হতে পারে। এ ছাড়া মব বা গণপিটুনিতে হত্যার শিকার হলে ধারা ৩০২ প্রযোজ্য। জড়িতদের বিরুদ্ধে হত্যার মামলা হয়, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এ ছাড়া বিশৃঙ্খল জনতা সংঘবদ্ধ হয়ে কাউকে সামান্য আঘাত করলে ধারা ৩২৩ প্রযোজ্য। গুরুতর আঘাত হলে ধারা ৩২৪ প্রযোজ্য। 

পুলিশের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) আইন ও তার প্রয়োগ নিয়ে নিয়মিত পড়াচ্ছেন এমন একাধিক কর্মকর্তা গতকাল রাতে সমকালকে বলেন, মবের ঘটনায় বর্তমানে প্রচলিত যেসব আইন রয়েছে, তা প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু তাতে তেমন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সময়ের প্রয়োজনে অনেক সময় আইন বদল করতে হয়। তাই মব নিয়ন্ত্রণে আইন সংশোধন বা নতুন আইন করা যেতে পারে। 

তবে আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের দেশে কোনো একটি অপরাধ হঠাৎ বেড়ে গেলে অনেক সময় নতুন আইন তৈরির দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে বিশ্বের অনেক দেশ হুটহাট নতুন নতুন আইন তৈরি করে না। তারা প্রচলিত আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করে থাকে। নতুনভাবে কঠোর আইন নয়; বিদ্যমান আইনের সঠিক প্রয়োগ করে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া জরুরি।’ 

ওভারটাইম ভাতা 

পুলিশের কল্যাণ সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী এবং বিচার বিভাগের মতো স্বতন্ত্র পে স্কেল চালু করার দাবি জানান পুলিশ সদস্যরা। এ ছাড়া মামলার তদন্ত কাজে গতি আনতে ও যাতায়াত ব্যবস্থার সমাধানে মোটরসাইকেল কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ ও মোটরসাইকেলের জ্বালানি খরচের বিল চালুর দাবি জানানো হয়। 

বিমানবন্দর থানার ওসি ও বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার কল্যাণ সভার আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি করে বলেন, তদন্ত ব্যয় বেড়েছে। সেটি বাড়িয়ে দেওয়া হোক। তদন্ত কাজে জড়িত এসআইদের জন্য থানা থেকে আলাদা কোনো যানবাহন দেওয়া হয় না। মোটরসাইকেল কিনতে অগ্রিম সুদমুক্ত ঋণ ও জ্বালানি খরচ দিলে তদন্ত কাজে গতি বাড়বে। একই সঙ্গে কল্যাণ সভায় ঝুঁকি ভাতাসহ ওভারটাইম ডিউটি বাবদ ভাতার দাবি উত্থাপন করেন একজন অতিরিক্ত পুলিশ পদমর্যাদার কর্মকর্তা।

আরেক পুলিশ সদস্য বলেন, কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক মর্যাদার সদস্যরা অবসরে যাওয়ার আগে যেন সম্মানসূচক এক র‌্যাঙ্ক পদোন্নতি পেতে পারেন। এটা সশস্ত্র বাহিনীতে আছে। এতে সরকারের বাড়তি অর্থ খরচ হবে না। অনারারি পদোন্নতি কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে।

কল্যাণ সভায় অংশ নেওয়া একজন ডিআইজি (ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল) বলেন, পুলিশের থানা, ব্যারাক, ফাঁড়িসহ বিভিন্ন ইউনিট পরিচালনার জন্য নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্প বাবদ অর্থ বরাদ্দ দীর্ঘদিন বন্ধ। সেটি নতুন করে চালুর দাবি জানানো হয়েছে। 

এ ছাড়া পুলিশের জন্য পৃথক পে স্কেল, চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ একাডেমি তৈরির বিষয়টি সামনে আসে। পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সশস্ত্র বাহিনী ও বিচার বিভাগে আলাদা পে স্কেল চালু আছে। পুলিশের জন্যও স্বতন্ত্র পে স্কেল করা প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের জন্য বিশেষ নীতিমালার ভিত্তিতে ওভারটাইম ভাতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। 

মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অনেক পুলিশ কনস্টেবল ৪০ বছর চাকরি করে অবসর নিয়েও পরবর্তী পদোন্নতি পান না। সে জন্য বিশেষ নীতিমালা ও সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ড বিবেচনায় অবসরকালীন কিছুসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে কনস্টেবল থেকে অনারারি সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) পদে; সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) থেকে অনারারি উপপরিদর্শক (এসআই) পদে এবং উপপরিদর্শক (এসআই) থেকে অনারারি পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের জন্য বিশেষ নীতিমালার ভিত্তিতে ওভারটাইম ভাতা দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার, যা তাদের মনোবল বৃদ্ধি ও সেবার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ইন্সপেক্টর থেকে নিম্নে কনস্টেবল পদ পর্যন্ত ওভারটাইম ভাতা বিবেচনা করা হতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অধিক কর্মচাপ বিবেচনায় পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালকে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিপূর্বক আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে আরও উন্নত হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। মন্ত্রী বলেন, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের ভবন বা কার্যালয় নির্মাণ ও আবাসন সমস্যা দূরীকরণে বর্তমান সরকার আন্তরিক। এ ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণসহ প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অনলাইন জুয়া বন্ধে বিশেষ কমিটি  

গতকাল পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানের আলোচনায় জুয়া ও অনলাইন জুয়া বন্ধের বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে আসে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এগুলো বন্ধে কী ধরনের আইনি কাঠামো প্রয়োজন, তা নির্ধারণে আমরা একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছি। অনলাইন জুয়া কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সাইবার ক্রাইম ও মানি ট্রান্সফার-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো একই আইনের আওতায় আনা যায় কিনা, পর্যালোচনা করবে এ কমিটি।

মন্ত্রী বলেন, ‘আইনের খসড়া এলে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। কারণ সময় বদলাচ্ছে; পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে; ইন্টারনেটভিত্তিক অপরাধের ধরনও পাল্টে গেছে। তাই পুরোনো আইন দিয়ে এখন আর চলা সম্ভব নয়। নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এসব অপরাধ কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজন হলে আমরা অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও গ্রহণ করব।’

আরও পড়ুন

×