মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানরোধে নতুন আইন, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সচেতনতামূলক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ১৯:৫৫ | আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ | ১৯:৫৬
মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে মানব পাচারকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, সম্পত্তি জব্দ এবং আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে অনলাইনে চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন, স্ক্যামিং ও অভিবাসনের নামে প্রতারণাকে মানব পাচারসংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মানব পাচার বৈশ্বিক সমস্যা মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার এই সমস্যা মোকাবিলায় আন্তরিক এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইন প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে আয়োজিত ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০২৬’ বিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। কর্মশালার আয়োজন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সহযোগিতায় ছিল জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার।
স্বরাষ্ট্রসচিব বলেন, ২০০০ সালে গৃহীত জাতিসংঘ কনভেনশন এবং এর সম্পূরক প্রোটোকলগুলোর আলোকে বাংলাদেশ সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। নতুন এই আইনে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতকরণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন প্রতারণা, স্ক্যামিং এবং মুক্তিপণ আদায়ের মতো আধুনিক অপরাধগুলোকে এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধে কেবল কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়, জনসচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যম কর্মীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কর্মশালায় জানানো হয়, ২০১২ সালের আইনে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানকে সঠিকভাবে আলাদা করা হয়নি। নতুন আইনে এই দু’টিকে পৃথক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। মানব পাচারের সংজ্ঞা জাতিসংঘের টিআইপি প্রোটোকল এবং অভিবাসী চোরাচালানের সংজ্ঞা এসওএম প্রোটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান সংক্রান্ত সব বিধান এই একটি আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
নতুন আইনে তদন্ত সংস্থাগুলোকে আরও শক্তিশালী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা এখন পাচারকারীদের ব্যাংক হিসাব জব্দ, আয়-সম্পদ যাচাই এবং সম্পত্তি ফ্রিজ করার ক্ষেত্রে ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জোরদার করা হয়েছে।
পাচারকারীকে সম্পত্তি ব্যবহার করতে দিলে বা নথি গোপন করে সহায়তা করলে ৩ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে নতুন আইনে। যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে কাউকে পাচার করলে ৩ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। অনলাইনে চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন বা অভিবাসনের নামে প্রতারণা করলে ৩ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত হয়েছে।
নতুন আইনে ভুক্তভোগী বা সাক্ষীকে হুমকি দিলে ৩ থেকে ৭ বছর এবং আপস করতে বাধ্য করলে ২ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাচারের শিকার থাকাকালীন ভুক্তভোগী যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো নির্দিষ্ট অবৈধ কাজ (জাল পাসপোর্ট বহন বা অবৈধ অনুপ্রবেশ) করলে তাকে আসামি হিসেবে গণ্য না করার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ভুক্তভোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রতি ৬ মাস অন্তর প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রেবেকা খান। কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার'র কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
- বিষয় :
- আইন
