গণশুনানিতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব
লোকসান ও ভর্তুকির দায় জনগণের ওপর চাপানো অযৌক্তিক
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ০৮:২২ | আপডেট: ২১ মে ২০২৬ | ০৮:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিদ্যুৎ খাতের লোকসান ও ভর্তুকির দায় জনগণের ওপর চাপাতেই মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমন উদ্যোগকে অযৌক্তিক ও গণবিরোধী বলছেন অংশীজন। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ভোক্তা অধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন অংশীজনের অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, ভুল পরিকল্পনা ও অপচয়ের দায় এখন সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা চলছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত গণশুনানিতে অংশীজনের এমন মতামত উঠে আসে। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গণশুনানির আয়োজন করেছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। দিনব্যাপী শুনানিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি বিদ্যুৎ এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) সঞ্চালন চার্জ বৃদ্ধির পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে। আজ বৃহস্পতিবার ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
শুনানিতে অংশীজন বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শুধু মাসিক বিল বাড়বে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারদর, শিল্প খাত, রপ্তানি, পরিবহন ব্যয় ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
সম্প্রতি পিডিবি প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের দাম ২১ থেকে ২৯ শতাংশ এবং পিজিসিবি সঞ্চালন চার্জ প্রায় ১৯ পয়সা বৃদ্ধির আবেদন করেছে। এ দুই প্রস্তাব কার্যকর হলে শেষ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়বে।
উৎপাদনের সঙ্গে ভর্তুকি বাড়ছে
পিডিবি তাদের প্রস্তাবে জানায়, বর্তমানে প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের দাম সাত টাকা চার পয়সা হলেও গত অর্থবছরে গড় উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় ১৩ টাকা ১৯ পয়সা। ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রিতে ছয় টাকা ১৫ পয়সা লোকসান হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
সংস্থাটির দাবি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিটে এক টাকা ২০ পয়সা দাম বাড়ানো হলে ভর্তুকির চাপ প্রায় ১৩ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমবে; আর দেড় টাকা বাড়ালে কমবে সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।
শুনানিতে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘দাম না বাড়ালে বিদ্যুৎ খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। আমরা যে প্রস্তাব দিয়েছি, তাতেও পুরোপুরি ব্রেক-ইভেন পয়েন্টে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। ভর্তুকি পুরোপুরি বন্ধ হবে না, তবে সরকারের ওপর চাপ কিছুটা কমবে।’
বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি জানিয়েছে, বিদ্যুতের পাইকারি দাম প্রায় ৭৭ শতাংশ বাড়ানো হলে ভর্তুকি পুরোপুরি উঠে যাবে। তবে এক ধাপে এত বড় বৃদ্ধি বাস্তবসম্মত নয় বলেও মত দিয়েছে কমিটি।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির লাভে ভাগ চায় পিডিবি
নিজেদের প্রস্তাবে পিডিবি লাভজনক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আয়ের ভাগ চেয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ৮০টি সমিতির মাধ্যমে প্রায় তিন কোটি ৭০ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। যেখানে দীর্ঘদিন ধরে ‘ক্রস সাবসিডি’ ব্যবস্থার মাধ্যমে লাভজনক সমিতিগুলোর আয় দিয়ে লোকসানি সমিতিগুলো চালানো হচ্ছে। পিডিবির দাবি, বর্তমানে আরইবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনছে ছয় টাকা ২৪ পয়সায়, যেখানে গড় পাইকারি দাম সাত টাকা চার পয়সা। এতে সরকারের ভর্তুকির বড় অংশ আরইবি খাতে ব্যয় হচ্ছে দাবি পিডিবির। এ অবস্থায় সংস্থাটি প্রস্তাব দিয়েছে, আরইবির লাভজনক ২১টি সমিতিকে ডেসকো ও ডিপিডিসির মতো উচ্চ দরে পাইকারি বিদ্যুৎ নির্ধারণ করা হোক, যাতে ভর্তুকির চাপ কমে।
আরইবির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মাত্র ১৩টি সমিতি মুনাফা করেছে, চারটি সমতাভিত্তিক ছিল এবং বাকি ৬৩টি সমিতি লোকসানে চলেছে। এসব লোকসানি সমিতি টিকিয়ে রাখতে লাভজনক সমিতির আয় থেকে প্রায় তিন হাজার ৫১৫ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। আরইবির কর্মকর্তারা বলছেন, এই নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে বর্তমান গ্রামীণ বিদ্যুৎ সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হবে ।
তবে ২১টি সমিতির জন্য আলাদা পাইকারি দাম নির্ধারণের প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছে বিইআরসির কারিগরি কমিটি।
সঞ্চালন চার্জ
পিজিসিবি বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য প্রায় ৩০ পয়সা সঞ্চালন চার্জ নেয়। প্রতিষ্ঠানটি তা বাড়িয়ে প্রায় ৪৯ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রশিদ খান শুনানিতে বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার ভিত্তিতে সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।
কিন্তু প্রত্যাশিত পরিমাণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন না হওয়ায় বিনিয়োগের বিপরীতে আয় বাড়েনি। বর্তমানে সংস্থাটির ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা।
তবে বিইআরসির কারিগরি কমিটি বলছে, প্রস্তাবিত হারের তুলনায় কিছুটা কমিয়ে ইউনিটপ্রতি সঞ্চালন ব্যয় প্রায় ৪৪ পয়সা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
মানুষের বাঁচা গুরুত্বপূর্ণ
শুনানিতে অংশ নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিবার একই কথা বলা হয় যে দাম না বাড়ালে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। কিন্তু মানুষ কীভাবে বাঁচবে, সংসার চালাবে, সেটা কেউ বিবেচনায় নেয় না। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিইআরসির কার্যক্রমে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন নেই। জনগণের মতামত নেওয়ার নামে বারবার শুনানি হচ্ছে, তার পর ঠিকই দাম বাড়ানো হচ্ছে। এতে মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, এমনিতেই দেশের শিল্প খাত চাপে আছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই এই প্রস্তাব বাতিল করা উচিত।
ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার প্রয়োজনে আরও ভর্তুকি দিক, কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নেতা জালালুদ্দিন বলেন, রপ্তানি খাত এখন কঠিন সময় পার করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
স্বচ্ছতার অভাবেই বাড়ছে দাম
গণশুনানিতে এবার অংশ নেননি ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিদ্যুৎ খাতে অপচয় ও অনিয়ম কমিয়ে কীভাবে ব্যয় সাশ্রয় করা যায়, সে বিষয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরে আসছেন।
ক্যাব তাদের লিখিত বক্তব্যে বলেছে, বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবের কারণেই বারবার মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের লুণ্ঠন ও ভুল পরিকল্পনার দায় জনগণের ওপর চাপানো গ্রহণযোগ্য নয়।
কমিশনের বক্তব্য
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘সব পক্ষের মতামত আমরা শুনেছি। কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং সরকারের ভর্তুকি সক্ষমতা বিবেচনা করে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।’ তিনি জানান, আগামী ২৩ মে পর্যন্ত ভোক্তারা লিখিতভাবে তাদের মতামত কমিশনে জমা দিতে পারবেন।
- বিষয় :
- বিদ্যুতায়ন
- ভর্তুকি
