ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অভিমত

মানবিক মূল্যবোধের বিষয়ে আমরা পিছিয়ে পড়ছি

মানবিক মূল্যবোধের বিষয়ে আমরা পিছিয়ে পড়ছি
×

ড. তৌহিদুল হক

ড. তৌহিদুল হক

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৯:০৫ | আপডেট: ২২ মে ২০২৬ | ০৯:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি হত্যার পর দেহ অসংখ্য টুকরো করা হচ্ছে এবং সেগুলো বিভিন্ন জায়গায় ফেলে অপরাধের আলামত নষ্ট করা হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা কিংবা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘাত-সহিংসতা বা শিশুর বিরুদ্ধে যৌন নির্মমতা নানা কারণে বেড়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতা রুখতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।

অপরাধ করে পার পাওয়ার জন্য আলামত নষ্ট করার যে প্রবণতা, তা সমাজের ভেতরের অস্থিরতা ও অপরাধপ্রবণতাকে ইঙ্গিত করে।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত জটিলতায় সময়ক্ষেপণের কারণে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। এটি সমাজব্যবস্থার জন্য ভয়ংকর।

আবার বিচারের ক্ষেত্রে যদি মনে করা হয়, মামলা হলো ও অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হলো, অর্থাৎ বিচারের অর্ধেক কাজ শেষ কিংবা এটিই বিচার– তখন এটি সমাজের মধ্যে কোনো ইতিবাচক বার্তা তৈরি করে না। বরং আমরা দেখি, সময়ের প্রেক্ষাপটে অপরাধগুলো নানাভাবে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

একটা সময় বিচারের পরিবর্তে অনেক ঘটনার মীমাংসা হয়। আবার নতুন নতুন ঘটনায় পুরোনো ঘটনা ধামাচাপা পড়া কিংবা নানাভাবে মীমাংসা করে দেওয়ার যে উদাহরণ আছে, তা অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ অপরাধ করে বিচারের পরিবর্তে যদি মীমাংসার সংস্কৃতি বেশি প্রাধান্য পায়, তখন অপরাধীরা নানাভাবে সক্রিয় হয়। 

অপরাধের বিষয়বস্তু নিয়ে যে চলচ্চিত্র বা সাহিত্যের অনুষঙ্গ তৈরি হচ্ছে, তা আমাদের তরুণদের বীভৎস কৌশলে অপরাধ করার জন্য প্ররোচিত করে। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশে সামাজিক, ধর্মীয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক যে মূল্যবোধ, যে আদর্শিক ধারা একজন ব্যক্তির মধ্যে থাকার কথা, সেই প্রশ্নে আমাদের সূচক নিচের দিকে। ক্ষমতা, অর্থ, সামাজিক মর্যাদার প্রভাব ও দাপট সমাজের সর্বত্র লক্ষ্য করে যাচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধ কিংবা জেন্ডারভিত্তিক সহনশীলতার প্রশ্নে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি।

প্রান্তিক পর্যায়ে অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক যে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা কার্যক্রম ছিল, সেগুলো দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। এ কারণে অপরাধীদের বা সমাজের মধ্যে দাপট বা প্রভাব বিস্তারকারী শক্তির এক ধরনের প্রাধান্য তৈরি হচ্ছে। যারা সমাজের প্রান্তিক বৈশিষ্ট্যের মানুষ কিংবা জেন্ডারগতভাবে পিছিয়ে পড়া অথবা সংবেদনশীল অবস্থায় আছেন, তাদের ওপর বেশি আক্রমণ হচ্ছে। 

আমাদের দেশে যেসব অপরাধ হচ্ছে, তা শিশুর প্রতি সহিংসতা বা ধর্ষণ হোক, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে হোক, একজন পুরুষের ক্ষেত্রে হোক বা একজন ছেলেশিশুর ক্ষেত্রে হোক, অধিকাংশ অপরাধের ক্ষেত্রেই আমরা দেখি যে প্রান্তিক বৈশিষ্ট্যের মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

এই প্রান্তিক বৈশিষ্ট্যের মানুষদের নিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক দরকষাকষি আছে। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে তাদের জন্য একটি নিরাপদ এবং ন্যূনতম জীবন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য যে প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক দলগুলো করে থাকে, এর খুব অল্পসংখ্যক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে। প্রান্তিক বৈশিষ্ট্যের মানুষদের ভোটের যে কদর আছে, তাদের জীবনের কদর কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সেই পরিমাণে নেই। রাষ্ট্র যতদিন পর্যন্ত সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি স্বতন্ত্র জীবনব্যবস্থা তৈরি করতে না পারবে, ততদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রের এই পিছিয়ে পড়া মানুষের ওপর অন্যায়-অবিচার সবচেয়ে বেশি হবে। আইনের শাসন দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োগ করা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের সহিংসতা প্রতিরোধ করা প্রয়োজন।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ 

 

আরও পড়ুন

×