ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিদ্যুতের দাম নিয়ে গণশুনানি

গ্রাহক পর্যায়ে ১০% দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব, তীব্র আপত্তি

গ্রাহক পর্যায়ে ১০% দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব, তীব্র আপত্তি
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৯:১০ | আপডেট: ২২ মে ২০২৬ | ১০:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ঘিরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস, চুরি ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর বাড়তি ব্যয় নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ভোক্তা প্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে অপচয়, অদক্ষতা ও অস্বচ্ছ চুক্তি কমানো গেলে বারবার দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না।

গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের গণশুনানিতে পিডিবিসহ ছয়টি বিতরণ কোম্পানির খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। শুনানিতে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদও স্বীকার করেন, ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে সরকারের ভর্তুকির চাপ অস্বাভাবিক বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

দাম বৃদ্ধি নয়, কমাতে হবে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, প্রতিবছর শুধু ক্যাপাসিটি চার্জের নামে ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই অর্থ তুলতেই একদিকে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে, অন্যদিকে গ্রাহকের ওপর দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর শুনানি নিয়মিত হচ্ছে, কিন্তু দাম কমানোর রূপরেখা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। বিদ্যুৎ খাতের ফিন্যান্সিয়াল অডিট ও বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি পর্যালোচনা এখন জরুরি। 

পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে অডিটের ঘোষণা দেওয়ার পর অনেক কোম্পানি নতুন শর্তে চুক্তিতে যেতে রাজি হয়েছিল।

সিনিয়র সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার এ সময়ে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নতুন সরকারের সামাজিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ খাতকে লাভনির্ভর না করে সেবামুখী কাঠামোয় আনার আহ্বান জানান।

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মূল চাপ পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। তিনি ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে দেওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাবও দেন। তাঁর মতে, বিদ্যুৎকে বাণিজ্যিক পণ্য নয়, মৌলিক সেবা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জেবুন্নেসা বলেন, অবৈধ সংযোগ ও সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় গ্রাহকের ওপর চাপানো ঠিক নয়। দুর্নীতি বন্ধ না হলে দাম বাড়ানোর প্রবণতা চলতে থাকবে।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন ধরনের কর ও শুল্ক কমালেও ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব। তিনি লাইফলাইন সুবিধা সীমিত করার বিরোধিতা করেন।

ক্যাপাসিটি চার্জ বড় আর্থিক বোঝা 
সমালোচনার জবাবে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির আওতায় থাকা ক্যাপাসিটি চার্জ এখন বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণও বেড়েছে।

তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ ও ফিন্যান্সিয়াল অডিটের বিষয়টি কমিশন গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো প্রকল্প নিতে হলে বিইআরসির অনুমোদন লাগবে।

পাঁচ কোটি গ্রাহকের ওপর নতুন চাপ
বর্তমানে দেশে ছয়টি সরকারি বিতরণ সংস্থার মোট গ্রাহক প্রায় পাঁচ কোটি। এর মধ্যে প্রায় চার কোটিই আবাসিক গ্রাহক। বিতরণ লাইনে গড় সিস্টেম লস ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ হলেও কিছু প্রতিষ্ঠানে তা প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি।

লোকসান ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে সব বিতরণ সংস্থাই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন করেছে। পাশাপাশি নতুন চার্জ আরোপ, লাইফলাইন সুবিধা সীমিত করা এবং গ্রাহকশ্রেণি পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবও দিয়েছে।

পিডিবি জানিয়েছে, বর্তমান ট্যারিফ বহাল থাকলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি ইউনিটে তাদের ২৯ পয়সা ঘাটতি হবে। এ জন্য তারা এলটি (লো ভোল্টেজ) গ্রাহকের সীমা ৮০ কিলোওয়াট থেকে কমিয়ে ৫০ কিলোওয়াট করার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় আনার প্রস্তাব করেছে।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন সমিতিগুলো গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি চেয়েছে। তারা বলছে, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য ৮ টাকা ৫০ পয়সা হলেও লোকসান এড়াতে তা কমপক্ষে ৯ টাকায় নিতে হবে। 

ডিপিডিসি প্রায় ৭ শতাংশ দাম বাড়ানোর পাশাপাশি প্রিপেইড মিটারে নতুন সিকিউরিটি চার্জ আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। ডেসকো জানিয়েছে, গত তিন বছরে তাদের ঘাটতি ২ হাজার ৬১১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এ কারণে তারা প্রায় ১০ শতাংশ দাম বাড়ানোর আবেদন করেছে।

ওজোপাডিকো বলছে, প্রতি ইউনিটে তাদের ঘাটতি ৮৫ পয়সার বেশি। নেসকোর দাবি, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। আগামী অর্থবছরে তাদের নিজস্ব বিতরণ ব্যয় প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৬৬ পয়সায় পৌঁছাবে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ
গণশুনানিতে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরাও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করেন। তারা বলেন, শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় আগেই অনেক বেড়ে গেছে। এর মধ্যে আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে দেশের উৎপাদনশীল শিল্প বড় চাপের মুখে পড়বে। বিশেষ করে ইস্পাত খাতে বিদ্যুৎ বিল উৎপাদন খরচের বড় অংশ হওয়ায় নতুন ট্যারিফ শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
 
কারিগরি কমিটির আপত্তি
বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটিও কয়েকটি প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে। কমিটির মতে, এলটি গ্রাহকের সীমা ৮০ কিলোওয়াট থেকে ৫০ কিলোওয়াটে নামানোর আগে স্বাধীন গবেষণার মাধ্যমে এর প্রভাব যাচাই করা প্রয়োজন।

বেসরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরাসরি বাণিজ্যিক গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করাটা সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মত দিয়েছে কমিটি।
কমিটি আরও বলেছে, অনুমানের ভিত্তিতে অতিরিক্ত লোড নির্ধারণ না করে পর্যায়ক্রমে ডিমান্ড মিটার স্থাপন করা উচিত। অন্যথায় গ্রাহকদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির তৎপরতা বন্ধের দাবি
নতুন করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির তৎপরতা থেকে সরে আসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। একই সঙ্গে আগামী জাতীয় বাজেট প্রস্তাবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বরাদ্দসহ সামগ্রিক পরিকল্পনা পেশ করার দাবি জানিয়েছে দলটি।

গতকাল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এক বিবৃতিতে এই দাবি জানান। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় আবারও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে চুরি, দুর্নীতি, অপচয় ও অব্যবস্থাপনা কমিয়ে আনতে পারলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে না।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির জন্য বিইআরসির গণশুনানিকে লোকদেখানো আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, তাদের কাজই হচ্ছে সরকারের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে জায়েজ করা। বিইআরসির বিদ্যমান আইনের পরিবর্তন করতে হবে, যাতে তারা বিদ্যুতের দাম কমানোর ব্যাপারেও সরকারকে সুপারিশ করতে পারে।

আরও পড়ুন

×