নীতি সংলাপে অর্থমন্ত্রী
দুর্নীতি নিয়ে বেসরকারি খাতকেও কথা বলতে হবে
কিছু ব্যাংক মালিকের বিলাসী জীবনযাত্রা নিয়ে ক্ষোভ
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল শুক্রবার ‘পোস্ট-আপরাইজিং ইকোনমি অ্যান্ড জিওপলিটিক্স অব বাজেট’ শীর্ষক নীতি সংলাপে অতিথিরা - সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৮:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতেরও কথা বলা দরকার। তাদের দায়িত্ব আছে। বেসরকারি খাত নিরাপদ দূরত্বে বসে থাকতে পারে না। কোন কোন জায়গায় সমস্যা হয়েছিল, কেন হয়েছিল, সেগুলো আপনাদের বলতে হবে।’
শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে ‘পোস্ট-আপরাইজিং ইকোনমি অ্যান্ড জিওপলিটিক্স অব বাজেট (এম সাইফুর রহমানের অবদান স্মরণ)’ শীর্ষক নীতি সংলাপে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে খেলাপি ঋণে জর্জরিত একটি ব্যাংকের মালিকপক্ষের উদাহরণ টেনে অর্থমন্ত্রী ব্যাংক মালিকদের বিলাসী জীবনযাত্রা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমার কাছে ব্যাংক মালিকদের একটা দল এসেছিল। দুই হাজার কোটি টাকা না হলে উনাদের ব্যাংক চলবে না। ওনাদের নাকি ৯৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ হয়ে গিয়েছিল। এখন উনি (একজন ব্যাংক মালিক) আমাকে বলছেন, ‘স্যার, আমরা কিন্তু খেলাপি ৯৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫৬ শতাংশে নিয়ে আসছি।’ একবার ভাবুন, কেমন মানসিকতা তাদের। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাংকের মালিকদের জীবনযাপন কেমন তা আমরা সব জানি।’’
ব্যাংক খাতের টাকা লুটপাটের পেছনে দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষার বড় দায় আছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে আর্থিক প্রতিবেদনের মান খুব খারাপ জায়গায় আছে। আর্থিক প্রতিবেদন যথাযথ না হলে পুরো হিসাবের আসল চিত্র ঠিকমতো প্রকাশ পায় না। ব্যাংকগুলো থেকে অর্থায়নের টাকা-পয়সা যে লুটপাট হয়েছে, এর জন্য কোনো না কোনোভাবে এই দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদনই দায়ী।
অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারের বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে পুঁজিবাজারের গঠনে বড় পরিবর্তন দেখা যাবে। সেখানে কোনো রাজনৈতিক লোক নিয়োগ দেওয়া হবে না, বরং পেশাদার ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন সংকট মেটাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা (আইএফসি) এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোকে যুক্ত করে ব্যাংকিং খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে কোনো স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ নেই, যা সম্ভবত পৃথিবীর বুকে একটি বিরল ঘটনা। ফলে দেশের বাজার ব্যবস্থার ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল। মাত্র ৫, ৭ বা ১৫-২০ দিনের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলেই দেশের বাজার তা সহ্য করতে পারে না।
বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহারের ঘোষণা দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে চুক্তি সইয়ের দিন থেকে শুরু করে এলসি খোলা, শিপমেন্ট এবং দেশে এনে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানোর পুরো সরবরাহ চেইনকে (সাপ্লাই চেইন) একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা
‘এআই মডেল’-এর আওতায় আনা হচ্ছে। এই ডিজিটাল মডেলের মাধ্যমে পণ্যের সার্বিক সরবরাহ ও গতিবিধি (মবিলিটি) সম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
অব্যবস্থাপনার খেসারত দিচ্ছে জ্বালানি খাত
গত ১৭ বছর ধরে দেশের ভূগর্ভ ও সমুদ্রে কোনো তেল-গ্যাস অনুসন্ধান না করার খেসারত এখন পুরো জাতিকে দিতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, বিগত দিনে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে সম্পূর্ণ ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দিয়ে দেশকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মুখে ফেলেছে। তবে সংকট কাটাতে আগামী সোমবার আন্তর্জাতিক দরপত্রের (অফশোর টেন্ডার) মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের বড় উদ্যোগ শুরু হচ্ছে বলে জানান জ্বালানিমন্ত্রী।
বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়াকে আত্মঘাতী উল্লেখ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘এখন কুইক রেন্টাল ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর হাতে চাবিকাঠি। আমার পাওয়ার স্টেশন চলে না, অথচ চুক্তি অনুযায়ী তাদের বসিয়ে বসিয়ে টাকা (ক্যাপাসিটি চার্জ) দিতে হচ্ছে। কী এক জটলা তৈরি করে দিয়ে গেছে! প্রতিদিন সকালে উঠেই বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো টাকা চায়, টাকা না দিলে বিদ্যুৎ বন্ধের হুমকি দেয়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিদিন আমাকে অর্থমন্ত্রীর কাছে টাকার জন্য দৌড়াতে হয়।’ তিনি জানান, শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া চালাতেই প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুতে নতুন নীতিমালা জুনের মধ্যে
জ্বালানির টেকসই বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর জোর দেওয়ার কথা জানিয়ে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, আমরা সোলার, উইন্ড (বায়ু বিদ্যুৎ) এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ (ওয়েস্ট টু পাওয়ার) উৎপাদনের কাজ করছি। জুনের মধ্যে একটি বিনিয়োগবান্ধব সোলার পলিসি (সৌরবিদ্যুৎ নীতি) দেওয়া হবে। বর্তমানে আমাদের ট্যাক্স স্ট্রাকচার বা কর কাঠামো খুব খারাপ। বিশেষ করে সোলারের ব্যাটারির ওপর অতিরিক্ত কর থাকায় বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ পাচ্ছেন না। আমরা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এই ট্যাক্স কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আমাদের লক্ষ্য– চলতি মেয়াদের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যাওয়া।
অনুষ্ঠানে দুটি পৃথক অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফওজুল কবির খান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান শরীফ জহির, এনআরবি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ, বারভিডা সভাপতি আব্দুল হক, সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিমা ফেরদৌস প্রমুখ। প্রথম অধিবেশন সঞ্চালনা করেন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের হেড অব নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স জহিরুল আলম।
দ্বিতীয় অধিবেশন সঞ্চালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো
এবং গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী।
- বিষয় :
- দুর্নীতি
