পল্লবীতে শিশুহত্যা
পাঁচ দিনের মাথায় অভিযোগপত্র দাখিল, স্বামী-স্ত্রী আসামি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ০৭:০৩ | আপডেট: ২৫ মে ২০২৬ | ০৯:১০
রাজধানীর পল্লবীতে নৃশংসভাবে ৮ বছরের শিশুকে হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায় গতকাল রোববার অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। এতে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আদালত। আগামী ১ জুন এ মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরুর দিন ধার্য করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত গতকাল বিকেলে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে এ আদেশ দেন। এর আগে সকালে অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় আনা হয়।
এত কম সময়ে কোনো মামলার অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার নজির খুবই কম। ২০২৩ সালে মানিকগঞ্জ সদরের কৈতরা গ্রামের এক হ্যাচারিতে মো. রুবেল নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ৪২ ঘণ্টার মধ্যে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছিল। ওই মামলার তদন্তে বেশ কিছু ত্রুটি সামনে আসার পর তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।
পল্লবীতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশুটির এক স্বজন গতকাল সমকালকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিনের মাথায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া ইতিবাচক। আমরা চাই আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। এখন বিচার কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে হবে। আসামিদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর অভিযোগ দাখিলের মতো কম সময়ের মধ্যেই দণ্ড কার্যকর করতে হবে।’
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে ৮ বছর বয়সী শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা ও লাশ গুমের উদ্দেশ্যে মস্তক বিচ্ছিন্ন করার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। লাশ বিকৃতির অভিযোগও তদন্তে প্রমাণিত। সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে স্বামীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগপত্রে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতের পরিবারের চার সদস্য, চার পুলিশ সদস্যসহ ১৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া সমকালকে জানান, ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক ও ভিসেরা প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীসহ একাধিক ব্যক্তির সাক্ষ্য ও তদন্তে প্রাপ্ত অন্যান্য তথ্য-প্রমাণে সোহেলের বিরুদ্ধে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। এ ঘটনায় তাকে সহযোগিতা করে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। তদন্ত শেষে দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশব্যাপী প্রতিবাদ, বিক্ষোভ প্রকাশ করছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। শিশুর বাসায় গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বৃহস্পতিবার রাতে নিহতের বাসায় গিয়ে তিনি পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং দোষীদের দ্রুততম সময়ে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দেন।
গতকাল দুপুরে সচিবালয়ের এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অভিযোগপত্র দাখিলের পর পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে বিচারিক কাজ সম্পন্ন হবে।
যেভাবে দ্রুত তদন্ত শেষ হলো
মামলায় থানা পুলিশ, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ফরেনসিক বিভাগ, ময়নাতদন্তের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক সমন্বয় করে কাজ করেছেন। ঘটনার সাত ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এক দিনের মাথায় ১৬৪ ধারায় অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় সে। জবানবন্দিতে তার স্ত্রীর সহযোগিতার কথা আসায় তাকেও দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়।
অন্যদিকে সাধারণত ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে কয়েক মাস পেরিয়ে যায়। তবে পল্লবীর ঘটনায় দিনরাত কাজ করে আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। আদালতের বিশেষ অনুমতি নিয়ে মাত্র তিন দিনের মধ্যে সিআইডির ফরেনসিক ইউনিট পরীক্ষা সম্পন্ন করে। শনিবার বিকেলে রিপোর্ট তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়। ফরেনসিক বিভাগ থেকে দ্রুত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করে পুলিশ।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আইনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করার বিধান রয়েছে। তবে অধিকাংশ মামলার ক্ষেত্রে মাসের পর মাস চলে যায়। কারণ, একজন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে অনেক মামলার তদন্ত থাকে। ফরেনসিক ও মেডিকেল রিপোর্ট পেতে বিলম্ব হয়। ল্যাবগুলোতে সারাদেশ থেকে আসা হাজার হাজার নমুনা থাকে। সাধারণ মামলায় একটি ডিএনএ বা ভিসেরা রিপোর্ট আসতে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত লেগে যায়। ল্যাবের ক্লিয়ারেন্স না পাওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে পুলিশ অভিযোগপত্র জমা দিতে পারে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী ধর্ষণের মামলার তদন্ত ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তা সম্ভব হয় না।
আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা হিসেবে পল্লবীর মামলাটির তদন্ত দ্রুত শেষ করতে এক ধরনের ‘চাপ’ ছিল বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এসব কারণেই এত দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হয়েছে।
আসামির স্বীকারোক্তি
শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আসামি সোহেল রানা গত বুধবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে সে বলে, তার বাসার দরজা খোলার পর শিশুটিকে দেখে তার বিকৃত মানসিকতা জেগে ওঠে। ওই সময় ইয়াবায় আসক্ত হওয়ায় শিশুটিকে ডেকে শৌচাগারে নিয়ে ধর্ষণ করে সে। শিশুটি বাবা-মাকে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে সোহেল। হত্যাকাণ্ডের পর সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না বিষয়টি জানতে পারে। পরে স্বামীকে বাঁচাতে লাশ গুম করার পরিকল্পনা করে। এরপর শিশুটির মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে তারা। এক পর্যায়ে লাশ শোয়ার ঘরের খাটের নিচে রাখা হয়। এ সময় শিশুটির মা দরজায় নক করছিলেন। আসামি সোহেলকে পালানোর সুযোগ করে দিতে স্বপ্না দীর্ঘ সময় ঘরের দরজা খোলেনি। এই সুযোগে সোহেল জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। এর পর স্বপ্না দরজা খোলে।
ছুটিতেও আদালত খোলা থাকবে
পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের জন্য ঈদের ছুটিতেও সংশ্লিষ্ট আদালত খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। মন্ত্রী বলেন, শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারকাজ এগিয়ে নিতে ঈদের ছুটিতে সংশ্লিষ্ট আদালত খোলা রাখার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ
আসামিপক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছে সরকার। আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগ থেকে গতকাল এ-সংক্রান্ত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় খরচে আসামিপক্ষের মামলা পরিচালনায় ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্লাহকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর এবং আইনজীবী বিধি অনুযায়ী ভাতা পাবেন বলে জানানো হয়।
ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সমগ্র জাতি অসম্মানিত
পল্লবীর শিশু হত্যার ঘটনাকে ইঙ্গিত করে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘এই নৃশংস, নির্লজ্জ, ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য সমগ্র জাতি আজকে অসম্মানিত। আইনজীবী হিসেবে আমাদেরও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।’ দ্রুত বিচার নিশ্চিতে বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষের অভিজ্ঞতা হলো– বছরের পর বছর বিচার শেষ হয় না। তাই দ্রুত বিচারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
দেশে একের পর এক কন্যাশিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকালও রাজধানীতে মানববন্ধন করেছে বিভিন্ন সংগঠন। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে।
- বিষয় :
- রাজধানী
- শিশু ধর্ষণ
- শিশু হত্যা
