স্থানীয় সরকার নির্বাচন
পোস্টাল ব্যালটে ভোট না রাখার চিন্তা ইসির
ফাইল ছবি
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ১৪:৩৯
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট না রাখার চিন্তা-ভাবনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে এই প্রক্রিয়ায় আশানুরূপ সাড়া না মেলা এবং বিপুল অর্থব্যয় এড়াতে এমন চিন্তা করছে তারা। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সাংবিধানিক এই সংস্থাটি।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে প্রথমে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং পরে দেশের অভ্যন্তরে তিন শ্রেণির ব্যক্তির জন্য আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটে ভোটের পদ্ধতি চালু করে ইসি। তবে আশানুরূপ সাড়া পাননি তারা। বিশেষ করে প্রবাসী ভোটারদের আগ্রহ কম দেখা গেছে। সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের প্রবাসীদের মধ্যে এ নিয়ে উৎসবের আমেজ দেখা গেলেও অধিকাংশ দেশের প্রবাসীরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি।
আবার এতে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের যেটুকু সাড়া মিলেছে, সেটা বাস্তবায়ন করতে গিয়েও বিশাল অংকের অর্থের অপচয় হয়েছে। নিবন্ধন করেও অনেকে ভোট না দেওয়ায় এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতায় এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের ক্ষেত্রে যেটুকু উৎসাহ ছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেটাও নেই। এসব কারণে পরিকল্পনায় থাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিশেষত প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটে ভোটগ্রহণ থেকে সরে আসতে চাইছে ইসি।
এর আগে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সুপারিশে এ সংক্রান্ত আইন পরিবর্তন করে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার পদক্ষেপ নেয় ইসি। এ লক্ষ্যে প্রায় চারশত কোটি টাকা ব্যয়ে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট প্রকল্প গ্রহণ এবং ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ চালু করা হয়। শুরুতে প্রবাসীদের জন্য এটি চালু হলেও পরে দেশের ভেতর ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি চাকরিজীবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদেরও (কারাবন্দি) এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রবাসে থাকা ভোটারদের কাছে ডাকবিভাগের মাধ্যমে ব্যালট পাঠিয়ে আবার ফেরত আনার সব প্রক্রিয়া শেষ করতে ব্যয়বরাদ্দ ধরা হয় ভোটারপ্রতি ৭০০ টাকা। আর দেশের ভোটারদের পেছনে ব্যয় হয় জনপ্রতি ৫০ টাকা।
ইসি সূত্র বলছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে মোট ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন ভোটার নিবন্ধন করেন। এর মধ্যে প্রবাস থেকে ৭ লাখ ৬৭ হাজার ২৩৩ জন এবং দেশের ভেতরে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮ জন নিবন্ধিত হন। তাদের ভোট দিতে ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো হয়েছিল। তবে দেশ-বিদেশ মিলিয়ে ১২ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রবাস থেকে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭২ জন এবং দেশের ভেতর ৬ লাখ ৮০ হাজার ১১৬ জন ভোট দিয়েছেন। ভোট পড়েছে নিবন্ধিতদের ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ।
এদিকে, পোস্টাল ব্যালটে ভোটের ক্ষেত্রে অর্থের অপচয়ও ঘটেছে অনেকটাই। ইসির হিসেবেই ব্যালট পাঠালেও ভোট দেননি ২ লাখ ২২ হাজার ৮৬১ জন প্রবাসী। এক্ষেত্রে পুরোপুরি অপচয় হয়েছে ১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার বেশি। আবার ভোট দিয়ে ফেরত পাঠালেও সঠিকভাবে ভোট না দেওয়ায় বাতিল হওয়ায় প্রবাসীদের ২ লাখ ৯৫ হাজার ২৬০টি ব্যালটও কোনো কাজে আসেনি। এতে অপচয় হয় ২০ কোটি ৬৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা। একইভাবে দেশের অভ্যন্তরে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৭৪টি ব্যালট কোনো কাজে আসেনি। ফলে গচ্চা গেছে প্রায় ৮০ লাখ টাকা।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, শুরুতে বিশ্বের ১৪০টি দেশ থেকে ৫০ লাখ প্রবাসী পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবেন বলে প্রত্যাশা ছিল তাদের। এ নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণাও চালানো হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ও চার নির্বাচন কমিশনারসহ ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে এ সংক্রান্ত কার্যক্রমের উদ্বোধনসহ প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালান। পরে নিবন্ধনের চিত্র দেখে অন্তত ১০ লাখ প্রবাসী ভোটার এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবেন বলে মনে করেছিলেন তারা। দেশি ভোটার মিলিয়ে এই সংখ্যা ২০ লাখ হওয়ার প্রত্যাশাও ছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত এমন প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি। অবশ্য প্রবাসে ও দেশের অভ্যন্তরে আগে প্রচলিত ডাকযোগে ভোটদান পদ্ধতির বদলে আইটিসাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটে ভোট চালু করার সফলতা নিয়ে কিছুটা সন্তুষ্টি রয়েছে ইসিতে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সমকালকে বলেছেন, প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির ভিত্তিতেই মূলত আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ভোটিংয়ের ব্যবস্থা নিয়েছিল ইসি। কিন্তু সেই অর্থে সাড়া মেলেনি। এছাড়া এই প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয় যেমন হয়েছে, তেমনি ভোটারদের অজ্ঞতাসহ নানা কারণে বরাদ্দকৃত অর্থের অপচয় হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন বাস্তবতা হচ্ছে- জাতীয় নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোটের আইন হয়ে যাওয়ায়, সেখানে এটা আর বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে জাতীয় নির্বাচনে অনেক ব্যয়ের তুলনায় সাড়া কম এবং ভোটারদের আগ্রহ কম থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোটের ব্যবস্থা না রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। ইসির বৈঠকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নেওয়া হতে পারে।
- বিষয় :
- ইসি
- স্থানীয় সরকার নির্বাচন
- পোস্টাল ব্যালট
