বাবার আহাজারি
সন্তানদের নিয়ে বাসায় ফিরতে চেয়েছিলাম আজ, ফিরলাম কবর দিয়ে
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬ | ২৩:২৩
মাত্র চার দিন আগেও ছোট্ট সংসারজুড়ে ছিল নতুন অতিথি আসার আনন্দ। দুই ছেলেকে নিয়ে যে পরিবার নতুন করে স্বপ্ন গুনছিল, সেই ঘরেই এখন নেমে এসেছে নিঃশব্দ শোক। রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে মারা গেছে চার দিন বয়সী যমজ দুই নবজাতক ছেলে। সন্তান হারানোর পর বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মা নাজমা বেগম। আর বাবা হাসান সরদারের কণ্ঠে ঘুরেফিরে আসছে একটাই কথা- আজকে বাসায় নিয়ে ফিরতে চেয়েছিলাম, অথচ ফিরলাম কবর দিয়ে।
বুধবার দুপুরেই স্থানীয় মসজিদের কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে যমজ দুই নবজাতককে। সন্তানদের দাফন শেষে বাড়ি ফেরার পথে শোকে ভেঙে পড়া বাবা শুধু বলছিলেন, ‘আজ তো বাসায় আনার কথা ছিল…।’
এদিকে সন্তান হারানোর পর এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেননি মা নাজমা বেগম। তিনি শুধু নিঃশব্দে কাঁদছেন। কারও সাথে কথা বলছেন না।
রাজধানীর মাদারটেকের নন্দীপাড়া এলাকায় বসবাস করেন হাসান সরদার ও নাজমা বেগম দম্পতি। তাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দাসপাড়া গ্রামে। পেশায় ছোট ব্যবসায়ী হাসানের সংসারে আগে থেকেই ছিল দুই ছেলে সন্তান। এবার জন্ম নিয়েছিল যমজ দুই ছেলে। যাদের ঘিরে পরিবারে শুরু হয়েছিল নতুন স্বপ্নের গল্প।
হাসান সরদার জানান, শনিবার মাগরিবের পর স্ত্রীকে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি করেন। রোববার সিজারে জন্ম হয় যমজ সন্তান দুটির। অপারেশনের পর মা ও সন্তান দুজনই সুস্থ ছিলেন। তিনি বলেন, ‘তিন দিন ধরেই ডাক্তার-নার্সরা বলছিল বাচ্চাগুলো ভালো আছে। কাল রাতেও কোনো সমস্যা ছিল না।’
নবজাতক দুই শিশুর নাম রাখা হয়নি। তবে পরিবারে নাম নিয়ে আলোচনা চলছিল। যেহেতু তাদের অন্য দুই সন্তানের নাম ‘মোহাম্মদ আলী’ ও ‘আবু বকর আলী’, তাই নতুন দুই শিশুর নামও মিল রেখে রাখার পরিকল্পনা ছিল।
হাসান সরদারের অভিযোগ, রাতের দিকে হঠাৎ করেই ওয়ার্ডের ভেতরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে শিশু দুটির বমি শুরু হয়। ‘পরে শুনলাম রুমের ভেতরে গ্যাসের মতো কিছু ছিল। শুধু আমার বাচ্চা না, ওই রুমে থাকা আরও কয়েকটা বাচ্চাও অসুস্থ হয়ে পড়ে,’ বলেন তিনি।
তার অভিযোগ, শিশুদের অবস্থার দ্রুত অবনতি হলেও শুরুতে সঠিকভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অসুস্থ নবজাতককে নিয়ে একতলা থেকে আরেক তলায় ছোটাছুটি করতে হয়েছে স্বজনদের।
হাউমাউ করে কাঁদতে কাদঁতে হাসান সরদার বলেন, ‘একজন বলে পাঁচতলায় নেন, আরেকজন বলে চারতলায় নেন। অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে আমরা শুধু দৌড়াইছি।’ একপর্যায়ে যমজ দুই শিশুকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা আর নেই।
তিনি বলেন, ‘চার দিন ধরে আমার বাচ্চাগুলো হাসপাতালে ছিল। ডাক্তাররা যে টেস্ট দিছে, সব করাইছি। ১০ হাজার টাকার ওষুধও কিনছি। আমি তো কোনো কিছুতে না করি নাই। তারপরও আমার বাচ্চাগুলারে বাঁচাইতে পারল না।’
হাসান সরদার বলেন, ‘আমার বোন জামাই আর ছোট ভাই রুমে ঢুকছিল। ওরা জানায়, ভেতরে দাঁড়ানো যাচ্ছিল না। নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা ছিল।’
চার দিনের জীবনে পৃথিবীটাকে ঠিকমতো দেখার আগেই নিভে গেছে যমজ দুই শিশুর প্রাণ। তাদের চলে যাওয়ার পর পুরো পরিবারে এখন শুধু কান্না, শূন্যতা আর অসহনীয় নীরবতা।
হাসান সরদারের শেষ কথাগুলো যেন সেই শোকেরই প্রতিধ্বনি ‘যার যায়, সেই বোঝে ভাই…’
- বিষয় :
- হাসপাতাল
- হাসপাতালে মৃত্যু
- শিশুর মৃত্যু
