হরমুজ সচলের ইঙ্গিত নেই, দেশে জ্বালানির দাম বাড়ল, এরপর কী
দেশে সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম। ছবি: সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ১৬:৫২ | আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ | ১৮:৫৬
বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে দেশে অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। যা কার্যকর হয়েছে সোমবার থেকে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোও বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা কাটার অপেক্ষায়।
বার্তা সংস্থা এএফপির সোমবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর তৈরি হওয়া চাপ কমাতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করে। এর সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।
দেশের পাশাপাশি সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারেও দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ। কেনাবেচা হচ্ছে প্রতি ব্যারেল ৯৩ দশমিক ১৬ ডলারে। এই তেল আগামী আগস্ট মাসে সরবরাহের কথা।
গত সপ্তাহে হরমুজ খোলা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে তেলের দাম ১১ শতাংশ কমেছিল। কিন্তু এরপর দ্য নিউইয়র্ক টাইমসসহ একাধিক মার্কিন গণমাধ্যমে সমঝোতার কঠোর শর্ত নিয়ে খবর প্রকাশ হয়। এর পরপরই বাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেল।
হরমুজ সচলের অগ্রগতি কতদূর?
প্রণালি ঘিরে উভয়পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবরোধ ও দাবিগুলো মীমাংসার ব্যাপারে এখনো অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, যেকোনো নতুন সমঝোতা বা চুক্তির আওতায় প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে ইরান কোনো টোল আদায় করতে পারবে না। তবে ইরানি গণমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, সমঝোতার আলোচনায় এমন কোনো শর্ত নেই।

ইরানের পার্লামেন্টের সদস্য আলিরেজা সালিমির বরাত দিয়ে শনিবার বার্তা সংস্থা আইএসএনএ জানায়, প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ‘প্রশাসনিক ফি’ ধার্য করা সংক্রান্ত একটি বিল শিগগিরই পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হবে।
কোনো সমঝোতার আওতায় হরমুজ প্রণালি খোলার প্রক্রিয়াটি আরও কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। যেমন- পারমাণবিক কর্মসূচি ও বিভিন্ন দেশে জব্দ থাকা ইরানের ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড়ের দাবি। রোববার ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, হরমুজের পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিষয়টিও তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার। অর্থাৎ, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা বন্ধের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, জনগণের অধিকার বজায় রাখার বিষয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তেহরান কোনো চুক্তি অনুমোদন করবে না। যদিও তাসনিম নিউজ এজেন্সি বলছে, সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে এখনো আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশে এরপর কী?
দেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এএফপি লিখেছে, এর প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। সামান্য কমার পর গত এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়ায় ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি ও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় গত মার্চ মাসে সরকার জানিয়েছিল, তারা বহুপাক্ষিক দাতা সংস্থার কাছে থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন বা ২০০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। পরের মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানায়, ঢাকার অনুরোধে তারা নতুন একটি সহায়তা কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে।

তেলের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষ বিদ্যুতের দাম আরও একবার বাড়ানোর কথাও বিবেচনা করছে বলে লিখেছে এএফপি। মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। একই সঙ্গে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। ইতোমধ্যে প্রথম ধাপের ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করার কাজ শেষ হয়েছে।
অন্য দেশ যা করছে
বাংলাদেশের মতোই জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর দেশ ফিলিপাইন। সোমবার দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে তারা নিজস্ব সরকারি তেল মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফিলিপাইনের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড গড়ে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হন। নিজস্ব মজুতের পরিকল্পনার বিষয়ে জ্বালানিমন্ত্রী শ্যারন গারিন বলেছেন, এর লক্ষ্য জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহার করার জন্য অতিরিক্ত ৩০ দিনের তেল ও জ্বালানি মজুত রাখা। পাশাপাশি বেসরকারি তেল কোম্পানিগুলোকে আগের মতোই ৩০-৬০ দিনের মজুত রাখতে হবে।
জ্বালানিমন্ত্রী জানান, কৌশলগত সর্বজনীন মজুত গড়ে তুলতে বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজন। কেবল একটি ৫০ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতা সম্পন্ন স্টোরেজ ট্যাঙ্ক তৈরি করতেই খরচ হতে পারে প্রায় ৫০০ কোটি পেসো বা ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। তবে এই ৫০ লাখ ব্যারেল দেশটির মাত্র একদিনের জ্বালানি চাহিদার সমান।
শ্যারন গারিন আরও জানান, এই প্রকল্পে অর্থায়নের উৎস হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘ফিলিপাইন ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি’ এবং দেশের সার্বভৌম ওয়েলথ ফান্ড ‘মাহার্লিকা ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন’-কে বিবেচনা করা হচ্ছে। একটি মজুত গড়ে তোলা গেলে সংকটের মাঝেও নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে।
ফিলিপাইনের এই উদ্যোগকে জাপান সমর্থন দিয়েছে বলেও জানান শ্যারন। প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা যাচাই ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে টোকিও সহযোগিতা করতে চেয়েছে।
