বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই
তোফায়েল আহমেদ
সমকাল প্রতিবেদক ও ভোলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তিনি গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
ষাটের দশকের ছাত্র রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অগ্রসৈনিক ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি একমাত্র সন্তান ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীসহ অসংখ্য রাজনৈতিক সহকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা বেগম গত বছরের ২০ নভেম্বর মারা গেছেন।
তোফায়েল আহমেদের জামাতা ও সাবেক এমপি ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন সমকালকে জানান, নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। সেই থেকে তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালের সিসিইউতে সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. রায়হান রাব্বানীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
তোফায়েল আহমেদের শ্যালক পিন্টু তালুকদার ও ব্যক্তিগত সহকারী আবুল খায়ের জানান, গতকাল বাদ মাগরিব ধানমন্ডির ত্বাকওয়া মসজিদে জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। আজ সকালে হেলিকপ্টারে করে মরদেহ তাঁর জন্মস্থান ভোলায় নেওয়া হবে। বাদ জোহর ভোলা সরকারি হাইস্কুল মাঠ এবং সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে তাঁকে মা ফাতেমা খানমের কবরের পাশে দাফন করা হবে।
এদিকে তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। কেউ কেউ হাসপাতালে ছুটে যান। অনেকে জানাজায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাবের হোসেন চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবির কাওসার। জানাজার পর মসজিদের ভেতরে স্লোগান দেওয়া হলে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ, পরে ৭ জনকে আটক করে।
তোফায়েল আহমেদের পরিবারের কয়েকজন সদস্য জানান, প্রায় চার বছর আগে প্রথম দফায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর করোনায় আক্রান্ত হন ৯ বারের এই এমপি। এরপর তিনি আরেক দফায় করোনায় আক্রান্ত হন। সেই সঙ্গে কমপক্ষে দু’দফায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। ওই সময় থেকে তিনি কোনো কিছুই বোঝার মতো পরিস্থিতিতে ছিলেন না। তাঁকে অধিকাংশ সময় বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছে। প্রতিদিন গড়পড়তা প্রায় ১৮ ঘণ্টাই ঘুমিয়ে থাকতেন। হাঁটতে পারতেন না। চলাফেরা করতেন হুইলচেয়ারে। শেষ সময়ে কাউকে চিনতেনও না। বাঁ হাত ও পা একেবারেই অবশ হয়ে পড়ে। শরীরের একাংশ ছিল পক্ষাঘাতগ্রস্ত। একসময় তিনি স্মৃতিশক্তি হারান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে তাঁর নির্বাচনী এলাকা ভোলায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভাঙচুর, অস্ত্র প্রদর্শন ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ এনে মামলা হয়। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাঁর ব্যাংক হিসাব স্থগিত করে। কিন্তু স্ট্রোক-পরবর্তী শরীরের একাংশ প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া ও স্মৃতিভ্রম হওয়ায় তিনি জাগতিক কোনো কিছু বুঝে ওঠার মতো পরিস্থিতিতে ছিলেন না। ফলে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের পতন, পরে অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকারের দেশ পরিচালনা, এর কিছুই অনুধাবন করতে পারেননি।
তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর। তিনি ভোলা সরকারি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএসসি ও বিএসসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, কলেজের হোস্টেল অশ্বিনী কুমার হলের ভিপি, ১৯৬৫ সালে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের ভিপি, ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল ছাত্র সংসদের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচনে তিনি ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৭-৬৯ সময়কালে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত ভিপি।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রসমাজের মূল নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকা তোফায়েল আহমেদ ওই সময়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়কার প্রবল গণআন্দোলনে পাকিস্তান সরকার ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ওই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভার আয়োজন করে। লাখো জনতার সেই সমাবেশে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন তোফায়েল আহমেদ।
তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৭০, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ভোলা-১ আসনের এমপি ছিলেন।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তোফায়েল আহমেদ। এরপর তিনি ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এ বর্ষীয়ান নেতা। তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি এবং আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যও ছিলেন। তিনি কম করে হলেও সাতবার কারাবরণ করেন।
বিভিন্ন সংগঠনের শোক
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। এর মধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গভীর শোক এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির শোকবার্তায় এ মহান জাতীয় বীরের প্রতি দলের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানসহ দেশ ও জাতির প্রতি অবদানের জন্য তোফায়েল আহমেদ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক গতকাল এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ষাট দশকের গণসংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে যাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ তার মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
বাংলাদেশ যুব মৈত্রী কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি তৌহিদুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক তাপস দাস বিবৃতিতে বলেন, তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক এবং গণঅভ্যুত্থানের একজন নায়কের প্রস্থানে জাতি একজন অভিজ্ঞ, দেশপ্রেমিক ও সংগ্রামী রাজনীতিককে হারালো।
- বিষয় :
- তোফায়েল আহমেদ
