ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মামলা পরিচালনা ও সম্পদ হস্তান্তরে অর্ধশত আবেদন

মামলা পরিচালনা ও সম্পদ হস্তান্তরে অর্ধশত আবেদন
×

 কূটনৈতিক প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ | ১২:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে থাকা সম্পদ দেখভাল, বিক্রি, ব্যবস্থাপনা ও আইনি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিদেশে অবস্থানরত ব্যবসায়ী, রাজনীতিকসহ অনেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামার আবেদন করেছেন। এদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। 

বিদেশে বসে দেশের সম্পদ হস্তান্তরের জন্য এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক আমমোক্তারানামার আবেদন জমা পড়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আমমোক্তারনামার মাধ্যমে সম্পদ হস্তান্তর করে আবারও অর্থ পাচার করা হতে পারে।

আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন সামিট গ্রুপের আজিজ খান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা; সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা প্রয়াত এইচ টি ইমামের পরিবারের সদস্যরা; পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত; ডিজিএফআইর সাবেক প্রধান লে. জে. (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর; আওয়ামী লীগ নেতা রাশেক রহমান ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের আমমোক্তারনামার আবেদন আসা শুরু করে। তাদের মধ্যে আছেন ছাগলকাণ্ডে বিতর্কিত রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমানের মেয়ে কানাডাপ্রবাসী ফারজানা রহমান ঈপ্সিতা, আওয়ামী লীগ সরকারের উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের (ডিজিএফআই) সাবেক প্রধান, রাষ্ট্রদূত, পুলিশের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, এসেনসিয়াল ড্রাগ্স কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) সাবেক প্রধান, আইনজীবী, অভিনয়শিল্পী, ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আমমোক্তারনামার আবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অর্থ পাচার, হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আবেদন করেছেন। এ ছাড়া কিছু আবেদন এসেছে অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া, কানাডা ও থাইল্যান্ড থেকে। আবেদনকারীর সিংহভাগই দ্বৈত নাগরিক। 

বিদেশে অর্থ পাচার প্রতিরোধে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার। গত বছরের জুনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশনে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, বিগত সময়ে বিভিন্ন খাতে আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। অভিযুক্ত অনেকে বিদেশে অবস্থান করে তাদের অবৈধভাবে অর্জিত অর্থসম্পদ পাচারের চেষ্টা করছেন। অনেকেই বিদেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলোতে উপস্থিত হয়ে আমমোক্তারনামার মাধ্যমে তাদের দেশে থাকা সম্পত্তি ও অর্থ হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন। বিদেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলোর কাছে এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে এসব অপরাধীর আমমোক্তারনামার মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর করার সুযোগ থেকে যায়। এ অবস্থায় বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এবং দেশে এ সম্পর্কিত চলমান বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একটি হালনাগাদ তালিকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর কাছে থাকা প্রয়োজন। এ কারণে এ-সংক্রান্ত চলমান কোনো মামলায় বিচারাধীন ব্যক্তিদের একটি হালনাগাদ তালিকা অনতিবিলম্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠাতে চিঠিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, আমমোক্তারনামার আবেদনগুলো আসতে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর বিদেশে থাকা ব্যক্তিরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাদের আমমোক্তারনামা নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত তদবির আসছে। তদবিরকারীদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাসহ সমাজের উঁচুস্তরের ব্যক্তি। বিগত আমলগুলোতে বাংলাদেশ থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। আবারও অর্থ পাচারের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। 

সূত্র জানায়, আমমোক্তারনামার আবেদন নিয়ে বিপাকে পড়েছে বিদেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলো। কারণ, আবেদনকারীর সিংহভাগের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, তাদের অনেকেই অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য। তাই আবেদনকারীদের সাধারণ আমমোক্তারনামা সত্যায়নে মিশনগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশে থাকা সব মিশনকে জানায়, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের সাধারণ আমমোক্তারনামা সত্যায়ন স্থগিত রাখতে হবে। তবে বিশেষ বা সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আমমোক্তারনামার সত্যায়ন স্বাভাবিক নিয়মে করতে বিদেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

আমমোক্তারনামার আবেদনকারীর মধ্যে আরও আছেন– সামিট গ্রুপের আজিজ খানের পরিবারের সদস্য আঞ্জুমান আজিজ খান, আয়েশা আজিজ খন্দকার, আজিজা আজিজ খান, আদিবা আজিজ খান, মোহাম্মদ ফরিদ খান, মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খান; সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা প্রয়াত এইচ টি ইমামের মেয়ে নুসরাত আহমেদ, নিহাদ আহমেদ ও তাহসিন ইমাম; পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের মালিক চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহিদ ও ছেলে রাহিব সাফওয়ান সরাফাত চৌধুরী, রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান তাহের ইমাম; সাবেক হাইকমিশনার সৈয়দা মুনা তাসনিমের স্বামী তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী ও পরিবারের সদস্য চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীর ছেলে সাফায়েত আহমেদ চৌধুরী দীপ্ত, তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে জাবেদ আপগেনহাফেন।

এ ছাড়া রয়েছেন ইডিসিএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এসানুল কবির জগলুল এবং তাঁর ভাই মাহবুবুল কবির ও তারিকুল কবির, পুলিশের উপমহাপরিদর্শক মো. আবদুল বাতেন, পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ।

সিলভিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মিলন, রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য মো. ওয়াকিল উদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য এইচ এন আশিকুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য আবু জাফর মোহাম্মদ শফিউদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য সুবর্ণা মুস্তাফার স্বামী বদরুল আনাম সৌদ, ১১ কোটি বাংলাদেশির তথ্য বিক্রির অভিযোগে অভিযুক্ত ডিজিকন গ্লোবাল সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক ওয়াহিদুর রহমান শরিফ, প্রতীক গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ ফারুকী হাসান ও তাঁর মেয়ে ফারজানা হাসান এবং তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তার; জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডের চেয়ারম্যান চৌধুরী ফজলে ইমাম।

এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বিদেশে থাকায় অনেককে পাওয়া যায়নি। সামিট গ্রুপের আজিজ খান ও ফয়সাল করিম খানকে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠালে এবং ফোন করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। 

তবে আমমোক্তারনামার আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ নেতা রাশেক রহমান সমকালকে বলেন, প্রতিবছর কর পরিশোধ এবং মামলাগুলো পরিচালনার জন্য তিনি আমমোক্তারনামার আবেদন করেছেন।

আরও পড়ুন

×