ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

বেনজীরের দুর্নীতির ছয় মামলার নথি পাঠানো হবে দুবাই

বেনজীরের দুর্নীতির ছয় মামলার নথি পাঠানো হবে দুবাই
×

বেনজীর আহমেদ

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৯:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশটির সরকারের কাছে পাঠানোর জন্য তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ছয়টি মামলার নথিপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া দুটি হত্যাসহ ১৭টি মামলার নথিও প্রস্তুত করছে পুলিশ। এসব মামলার নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে পুলিশ সদরদপ্তর। 

গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বেনজীরের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরও ১০টি মামলা রয়েছে। সব মিলিয়ে গতকাল সোমবার পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম গতকাল এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে শিগগিরই সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে। তাঁকে ফেরাতে প্রয়োজনীয় সব নথি প্রস্তুত করার কাজ চলছে।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে শুধু দুদকের ছয়টি মামলার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হতে পারে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনার ১৭টি মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর নথি না পাঠানোর সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, দুদকের মামলায় ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) মাধ্যমে ইন্টারপোলে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সেই নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। 

গত শুক্রবার দুবাইয়ের ইন্টারপোল আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে বেনজীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি ইন্টারপোলের বাংলাদেশ পুলিশ সদরদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখা এনসিবিকে জানায়। রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরাতে ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে। সেই প্রত্যর্পণ আবেদন করার পাশাপাশি অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সেরে দ্রুতই তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

পুলিশ সদরদপ্তরের দায়িত্বশীল একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন এনসিবি আবুধাবি থেকে পাঠানো ইমেইলে জানানো হয়, দুর্নীতির মামলায় বেনজীর আহমেদকে দেশটির পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক লিখিত প্রত্যর্পণ অনুরোধ জমা দিতে বলা হয় ওই চিঠিতে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার জন্য ৩০ দিনের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও নথি চাওয়া হয়েছে। সেই নথি প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তিনি জানান, পুলিশ সদরদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখা এনসিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা গতকাল দুদকে মামলা সম্পর্কে খোঁজ নেন। দুদক নথিগুলো প্রস্তুত করে পুলিশ সদরদপ্তরে দিলে সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঠাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সংযু্ক্ত আরব আমিরাত সরকার বেনজীরকে ফেরত পাঠাবে– এটা নিয়ে আমরা আশাবাদী। দেশটি তাঁকে ফেরত পাঠাতে চায় বলেই তাঁর গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়ে আমাদের চিঠি দিয়েছে এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার জন্য সময়ও বেঁধে দিয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর বর্তমানে বেনজীরকে কোথায় রাখা রয়েছে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বাংলাদেশের পুলিশ দিতে পারেনি। তারা বলছে, এই ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর সাধারণত পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়। 

আরবি ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে নথি 
বেনজীর আহমেদকে ফেরত আনতে সব ধরনের নথিপত্রসহ আবেদন জানাবে দুদক। তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলার কপি, অভিযোগপত্র, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ অন্যান্য নথিপত্র হুবহু ইংরেজি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় ভাষা আরবিতে অনুবাদ করে শিগগির জমা দেওয়া হবে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে। এরপর ইন্টারপোলের বাংলাদেশ ফোকাল পয়েন্ট ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবেদনটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় দুবাই এনসিবির দপ্তরে পাঠাবে। 
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুদকের তদন্ত দল। রোববার দুবাই ইন্টারপোল থেকে তাঁর গ্রেপ্তার সংক্রান্ত পত্র পেয়েছে কমিশন। তাঁকে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করতে দুদক শিগগিরই আবেদন পাঠাবে পুলিশ সদরদপ্তরে। ইংরেজি ও আরবিতে লেখা এই আবেদনের সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলা সংক্রান্ত সব ধরনের নথিপত্র যুক্ত করা হবে। 
 
ট্রাইব্যুনালে ১০ মামলা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গতকাল নিজ কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘বেনজীর আহমেদ শুধু মতিঝিল শাপলা চত্বরের ঘটনায় কুশীলবই (মাস্টারমাইন্ড) নন; তিনি একসময় সরকার চালাতেন। তাঁর যে দম্ভোক্তি, তাঁর যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ; সব কিছু মিলিয়ে তখন দেশের কোনো কোনো জায়গায় শেখ হাসিনার চেয়েও বেশি পাওয়ারফুল ছিলেন বেনজীর আহমেদ। আমরা ধারণা করি, আওয়ামী লীগের শেষ সময়ে তাদেরই কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দলে তাঁর এসব কুকীর্তি প্রকাশ করে দেওয়া হয়। গণমাধ্যমে বেনজীরের সব কিছু দেখেছিলেন দেশবাসী। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে তখনই মামলা করেছিল দুদক।’ 

আমিনুল ইসলাম বলেন, বেনজীরের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় ১০টি মামলার তদন্ত চলছে। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি আছে। সেগুলো ইতোমধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনি যখন র‌্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন, তখন গুমের ঘটনায় হওয়া একটি মামলার বিচার চলছে। শাপলা চত্বরের অন্যতম কুশীলব বেনজীর দায়িত্বে থাকাকালীন অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও দাবি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এ দেশের গণতন্ত্র নস্যাৎ করতে হাজারো মানুষকে বিনা বিচারে হত্যাসহ অসংখ্য দায় রয়েছে বেনজীরের। অতএব তাঁর বিচারের ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ নজর দেব।’
আমিনুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারের কাউন্সিলর একরাম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বেনজীরের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি ডিএমপির কমিশনার হিসেবে অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। যখন আইজিপি ছিলেন তখন অসংখ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁকে যদি দেশে আনা হয় তাহলে এ ট্রাইব্যুনালে যেসব বিচার চলছে, সেগুলোতে হাজির করা হবে। তদন্তাধীন মামলায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর।

১১ থানায় ১৭ মামলা
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানিয়েছে, বেনজীরের বিরুদ্ধে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় রাজধানীর ১১ থানায় ১৭টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি হত্যাসহ মিরপুর থানায় চারটি মামলা আছে। এ ছাড়া হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন ধারায় গুলশান, হাজারীবাগ ও শেরেবাংলা নগর থানায় দুইটি করে এবং উত্তরা পশ্চিম, শাহবাগ, ভাটারা, শাহজাহানপুর, রমনা, যাত্রাবাড়ী ও হাতিরঝিল থানায় একটি করে মামলা রয়েছে। 

 

আরও পড়ুন

×