ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

গোলটেবিল আলোচনা

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ বাহিনী গড়ার তাগিদ

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ  বাহিনী গড়ার তাগিদ
×

বাংলামটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গতকাল সোমবার আয়োজিত গোলটেবিল আলােচনায় বক্তারা সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

পুলিশ সংস্কারকে নীতির মধ্যে সীমিত রাখা যাবে না। জবাবদিহি ও স্বাধীন তদারকের ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। জনগণের আস্থা ফেরানোয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।  

‘পুলিশ রিফর্ম ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস, পসিবিলিটিজ অ্যান্ড ফিউচার পাথওয়েজ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এ কথা বলেন। পাশাপাশি পুলিশ সংস্কার জাতীয় অগ্রাধিকার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে সংস্কারকে এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেন তারা। 

গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এ গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয়। সপ্রান (সকল প্রাণের নিরাপত্তা) নামের একটি সংগঠন এ সভার আয়োজন করে।
আলোচনার শুরুতে ‘দ্য মিসিং রিফর্ম: হোয়াই পুলিশ রিফর্ম হ্যাজ স্ট্রাগল্ড টু রিমেইন অন বাংলাদেশ পাবলিক এজেন্ডা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সপ্রানের গবেষক অপসরা ইসলাম। এতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ পুলিশের সার্বিক অগ্রগতি, দীর্ঘদিনের জবাবদিহির সংকট ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

প্রবন্ধ পাঠে অপসরা ইসলাম বলেন, গণঅভ্যুত্থান চলাকালে মাত্র চার দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ২৬ হাজারের বেশি গুলি, রাবার বুলেট ও শটগানের কার্তুজ ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষের চোখে আঘাত লাগে এবং অন্তত ৫৫০ জনের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যায়। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ছররা গুলির মতো বিতর্কিত অস্ত্রের ব্যবহার কমলেও সাউন্ড গ্রেনেড, লাঠিপেটা ও রাবার বুলেটের প্রয়োগ এখনও হচ্ছে। পাশাপাশি বিতর্কিত গ্রেপ্তার ও আটকের ঘটনাগুলোতে দৃষ্টি দিতে বলা হয়।

প্রবন্ধে বলা হয়, পুলিশ সংস্কার নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা ধীর হয়ে গেছে। নিরঙ্কুশ ঐকমত্য ও বিশদ সংস্কারের রূপরেখা থাকার পরও পুলিশ সংস্কার জাতীয়ভাবে অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। এ অবস্থায় সংস্কারের পক্ষে শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক-রাজনৈতিক জনসমর্থন গড়ে তোলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 

আলোচনায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, শুধু দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া বা বাহিনীর শক্তি বাড়ানোর মতো বিষয়ের মধ্যে সংস্কার সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এখানে মূল প্রশ্ন হলো পুলিশ জনগণের জন্য কাজ করবে, নাকি ক্ষমতাসীনদের জন্য। জুলাইয়ের ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন, সেটির নিবিড় পর্যালোচনা দরকার। 

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রে বাহিনীতে সকল জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে ফৌজদারি কার্যবিধিতে কিছু সংশোধন ইতিবাচক হলেও এসব আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা আছে। 

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, পুলিশ যেমন সরকারের নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও নিয়মিত প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। পুলিশকে রাজনীতিকীকরণ থেকে মুক্ত করে জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। 
পুলিশ সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে গোলটেবিলে অসন্তোষ প্রকাশ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতা উমামা ফাতেমা বলেন, পুলিশ সংস্কার শুধু নীতির মাধ্যমে করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সংস্কার কোনো বাইনারি বিষয় নয়। 

অল্টারনেটিভস নামে একটি প্ল্যাটফর্মের সংগঠক তাজনুভা জাবীন বলেন, সাধারণ মানুষ যেমন সংস্কার চায়, পুলিশ সদস্যরাও নিজেদের সংস্কার চান। এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ।
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম অ্যাকটিভেট রাইটসের নির্বাহী পরিচালক শোয়েব আবদুল্লাহ বলেন, জুলাইয়ের আগেও পুলিশি নির্যাতন, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রতিবাদ দমনে সহিংসতার অভিযোগ নিয়মিত উঠেছে। এ জন্য পুলিশ সংস্কারকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখতে হবে।

আলোচনায় আরও অংশ নেন ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক একেএম মাশরুর ফাহিম, সুইডেন দূতাবাসের মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও জেন্ডার সমতাবিষয়ক ফার্স্ট সেক্রেটারি পাওলা ক্যাস্ট্রো নাইডারস্টাম, ইউএনডিপি বাংলাদেশের রুল অব ল ও মানবাধিকার-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রোমানা শোয়াইগার, বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের পরিচালক শফিকুর রহমান, ডিগনিটি-ড্যানিশ ইনস্টিটিউট অ্যাগেইনস্ট টর্চারের বাংলাদেশ প্রকল্প ব্যবস্থাপক আশরাফুল আনোয়ার, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী, দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাইমা ইসলাম, ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারহান আরিফ প্রমুখ।

গোলটেবিল আলোচনাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম। সমাপনী বক্তব্য দেন সপ্রানের গবেষণা পরিচালক মো. জারিফ রহমান।

আরও পড়ুন

×