ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

রায়ে চাকরি পেলেও বেতন মিলছে না ছয় মাসেও

রায়ে চাকরি পেলেও বেতন মিলছে না ছয় মাসেও
×

ছবি: সমকাল

দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৭:০৭ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৬

দীর্ঘ ১৮ বছরের আইনি লড়াইয়ের পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে সরকারি চাকরি পেয়েছেন ২৭তম বিসিএসের বঞ্চিত কর্মকর্তারা। নিয়োগের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু ছয় মাস পরও তাদের বেতন হয়নি। এ কারণে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন ৬৭৩ কর্মকর্তা। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ২৭তম বিসিএসের প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিল করে দ্বিতীয়বার মৌখিক পরীক্ষা নেয়। এতে প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বহু প্রার্থী সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হন। শুরু হয় আইনি লড়াই। একাধিক আদালত ঘুরে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আপিল বিভাগ এক হাজার ১৩৭ জন বঞ্চিত প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

দীর্ঘসূত্রতা জনপ্রশাসনেই 
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রথম ধাপে ৬৭৩ জনকে এবং চলতি বছরের মে মাসে আরও ৯৬ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। বাকি ৩৬৮ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনও সম্পন্ন করেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এদিকে ৭৬৯ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে বেতন ও আর্থিক সুবিধা নির্ধারণ নিয়ে।

স্পষ্টীকরণ চিঠি নিয়ে বিলম্ব  
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ডিসেম্বরে নিয়োগপ্রাপ্ত ৬৩৭ কর্মকর্তার মধ্যে ৫৫০ জন গত ১ জানুয়ারি কর্মস্থলে যোগ দেন। তাদের নিয়োগ প্রজ্ঞাপনের অনুচ্ছেদ ১(ছ) স্পষ্টীকরণ চেয়ে গত এপ্রিলে জনপ্রশাসন অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠায়। সেই চিঠি গত ১৬ এপ্রিল অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ থেকে প্রবিধিতে পাঠানো হয়। প্রবিধি অনুবিভাগ ২৯ এপ্রিল বাস্তবায়নে তাদের মতামত পাঠিয়েছে। এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা চাকরিজীবনে কীভাবে সুবিধা পাবেন, সেই প্রক্রিয়ার বিষয়ে প্রবিধি অনুবিভাগ মতামত দিয়েছে। এখন বাস্তবায়ন অনুবিভাগ প্রত্যেকের চাকরিজীবন পর্যালোচনা করছে। কারণ, কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকে আগে থেকে সরকারি চাকরিতে ছিলেন, অনেকে চাকরিতে ছিলেন না। যারা সরকারি চাকরিতে ছিলেন, তাদের অনেকেই বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ ও সিনিয়র স্কেলে পদোন্নতি লাভের পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। আর যারা চাকরিতে ছিলেন না, তাদের এসব প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। সেই হিসেবে তাদের বেতন-ভাতা কম বেশি করে নির্ধারণ করে মতামত দেবে অর্থ বিভাগ। 

অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন-২ অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব আমিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকের বেতন-ভাতার বিষয়ে পৃথকভাবে মতামত প্রস্তুত করেছি। যারা সরকারি চাকরিতে আগে থেকে ছিলেন, তারা বেতন-ভাতা বেশি পাবেন। তবে প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতির পরীক্ষা সম্পন্ন হলে প্রত্যেকে সমান বেতন ও জ্যেষ্ঠতা পাবেন।’ তিনি বলেন, অর্থ বিভাগের মতামত আজ-কালের মধ্যে জনপ্রশাসনে পাঠানো হবে। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিষয়টির চূড়ান্ত সমাধান করবে। 

অর্থ বিভাগের মতামত
অর্থবিভাগের প্রবিধি শাখার মতামতে বলা হয়েছে, নিয়োগ প্রজ্ঞাপনের অনুচ্ছেদ-১(ছ) অনুযায়ী ৫৫০ জন কর্মকর্তার নিয়োগ আদেশ ইতোপূর্বে তাদের ব্যাচের নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রথম যে তারিখে নিয়োগ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল, সেই তারিখ থেকে ভূতাপেক্ষিকভাবে গণ্য করা হবে। একই সঙ্গে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাচের প্রথম নিয়োগ প্রজ্ঞাপনের যোগদানের তারিখ থেকে তাদের ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা বজায় থাকবে।

এ ছাড়া বিএসআর (প্রথম খণ্ড) এর ৪২(২) বিধি অনুসারে যে সব কর্মকর্তা বেতন সংরক্ষণের শর্তাদি প্রতিপালন করেছেন, তাদের পূর্ব পদের বেতন সংরক্ষণ করা যেতে পারে। চাকরি স্থায়ীকরণ এবং স্ব স্ব ক্যাডার সার্ভিসে পদোন্নতির আবশ্যিক শর্তাবলি পূরণ করায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরিকালীন অর্জিত যোগ্যতা সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

মানবেতর জীবন-যাপন করছেন কর্মকর্তারা
নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন নবনিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আদালতের রায়ে চাকরি পেয়েছি, সরকারের গেজেটে নাম এসেছে, অফিস করছি নিয়মিত। কিন্তু পরিবারের খরচ চালানোর জন্য এখনও ধার করতে হচ্ছে। চাকরি পেয়েও বেতন না পাওয়ার অভিজ্ঞতা কীভাবে ব্যাখ্যা করব, জানি না।’ 

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও লেখক ফিরোজ মিয়া বলেন, আদালতের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিয়োগ দেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বেতন-ভাতা ও সার্ভিস বেনিফিট নিশ্চিত করাও একই প্রক্রিয়ার অংশ। যদি নিয়োগ দেওয়া যায়, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা যায় এবং কর্মস্থলে যোগদান সম্পন্ন করা যায়, তাহলে বেতন নির্ধারণে এত দীর্ঘ সময় লাগছে কেন? এর আগে ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএসে একই ধরনের পরিস্থিতিতে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আরও পড়ুন

×