অক্টোবরের প্রথমার্ধে ইউপি নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা
হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রথম ধাপের ভোট হতে পারে
ফাইল ছবি
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১২ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪১
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) প্রণয়ন করেছে নির্বাচন কমিশন। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পৃথক রোডম্যাপ করা হয়েছে। চলতি মাসের শেষের দিকে এগুলো চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হতে পারে। আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে তপশিল ঘোষণা করে অক্টোবরের প্রথমার্ধে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সারাদেশকে হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চল, নদীপ্রধান ও চরাঞ্চল এবং সমতল ও শহরাঞ্চল– এই চার ভাগে ভাগ করে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ইউনিয়ন পরিষদের ভোট গ্রহণের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কার্যক্রম শুরু করবে ইসি।
এ ছাড়া ভোটের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করার জন্য মাঠ পর্যায়ে চিঠি দেওয়া হবে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ বছর হবে, তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন।
সূত্র আরও জানায়, অক্টোবরের প্রথমার্ধে ভোটের সময় ধরে ৪১ থেকে ৪৫ দিন আগে তপশিল ঘোষণার ব্যবস্থা করা হতে পারে। প্রতি বুথে নারী ভোটার ৫০০ এবং পুরুষ ভোটার ৬০০ জন নির্ধারণ করা হবে। ঋণখেলাপি সংক্রান্ত আইন পর্যালোচনা করতেও বলা হয়েছে।
রোডম্যাপে আরও যা থাকছে
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রাথমিক রোডম্যাপে ধাপভিত্তিক নির্বাচনের কিছু চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলা হয়েছে, অতীতে এক ধাপের নির্বাচন থেকে অন্য ধাপের নির্বাচনের সময়ের ব্যবধান কম ছিল। এতে মাঠ পর্যায়ে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই, আপিল নিষ্পত্তি, প্রতীক বরাদ্দ, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও ব্যালট পেপার পরিবহনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের সময়ের ব্যবধান কম থাকায় ভোটকেন্দ্রসহ আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গিয়ে দায়িত্ব পালনে অসুবিধা হয়।
নির্বাচনের সময় ও ধাপ নির্ধারণ বিষয়ে বলা হয়েছে, অতীতে কয়েকটি ধাপে বা এককভাবে সারাদেশে একসঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে ধাপ নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থা (যেমন হাওর, চরাঞ্চল, পার্বত্য জেলা), আবহাওয়া, পাবলিক পরীক্ষা (মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) এবং ধর্মীয় উৎসব বিবেচনা করে নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়।
এদিকে নির্বাচনের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক একাডেমিক ক্যালেন্ডার, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ধাপ নির্ধারণ করা হবে বলেও রোডম্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন ও বিধি সংশোধন কাজ শেষ করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া তপশিল ঘোষণার আগে ও পরে করণীয় সব কাজের সারসংক্ষেপও রোডম্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে। তপশিল ঘোষণার আগে করণীয় হিসেবে এতে বলা হয়, আইন-বিধি সংশোধন, সংশোধিত আইন ও বিধিমালার আলোকে ম্যানুয়াল নির্দেশিকা প্রণয়ন ও চূড়ান্ত করা, নির্বাচন পরিচালনা ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত বিভিন্ন ম্যানুয়াল ও নির্দেশিকা প্রস্তুত, নির্বাচনী দ্রব্যাদি এবং স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স সংগ্রহ ও ব্যবহার উপযোগী করা। ম্যানুয়াল, ফরম, প্যাকেট, প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা, পোস্টার, পরিচয়পত্র, নির্বাচনী সামগ্রী প্রস্তুত, সংগ্রহ ও মুদ্রণ; মনোনয়নপত্র, মনোনয়নপত্র পূরণের নির্দেশিকা, ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী মালপত্র মাঠ পর্যায়ে পাঠানো হবে। নির্বাচনের আগে ও পরের নির্বাচনী বাজেট প্রস্তুত ও বরাদ্দ সংক্রান্ত কার্যক্রম শেষ করা, ছবিসহ ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা, ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করার জন্য খসড়া প্রকাশ, দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তি ও অনুমোদন এবং ভোট গ্রহণের ১৫ দিন আগে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
তপশিল ঘোষণার ১৫ দিন আগে সেনাবাহিনীসহ সব বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করা হবে। এরপর প্রচারসামগ্রী অপসারণ, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল প্রস্তুত করে তপশিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। তপশিল ঘোষণার পর করণীয় হিসেবে বলা হয়েছে, রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ, নির্বাহী হাকিম ও বিচারিক হাকিম নিয়োগসহ বিভিন্ন পরিপত্র জারি করবে ইসি। অভিযোগ গ্রহণে অঞ্চলভিত্তিক কর্মকর্তা নিয়োগ, ঋণখেলাপিদের তথ্য সংগ্রহে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত পরিপত্র জারি ও বৈঠক করা হবে। এ ছাড়া ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল চূড়ান্ত, ট্রাইব্যুনাল গঠন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের ভোট পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দেওয়া হবে।
ভোট গ্রহণের দিনের কার্যক্রম হিসেবে রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ফলাফল সংগ্রহ ও বিতরণ, ডাকযোগে ফলাফল গ্রহণ, ভোট গ্রহণের ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ এবং ৬ থেকে ৭ দিনের মধ্যে নির্বাচিত প্রার্থীদের নামে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদের। ২০২১-২২ অর্থবছরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩ হাজার ৯৮১টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১০টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে। মামলা, সীমানা জটিলতাসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন নির্বাচন হয়নি ১০৮টি ইউনিয়ন পরিষদের। দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ ৪ হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে চলতি বছরেই নির্বাচন উপযোগী হবে ৩ হাজার ৯৮১টি। বাকিগুলো ২০২৭ ও ২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে।
পৌরসভা নির্বাচনের রোডম্যাপ অনুযায়ী, দেশের মোট ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে নির্বাচন উপযোগী ৩২০টি। আইনি জটিলতার কারণে ১০টি পৌরসভা নির্বাচন উপযোগী নয়। উপজেলা পরিষদের রোডম্যাপ থেকে জানা যায়, কোনো উপজেলাতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সবই নির্বাচনের উপযোগী।
সিটি করপোরেশনের রোডম্যাপ অনুযায়ী, নতুন সিটি করপোরেশন বগুড়াসহ ১৩টি সিটি করপোরেশনের কোনোটিতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সবই নির্বাচনের উপযোগী।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে শুরু হতে পারে– জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সমকালকে বলেন, ‘আমরা অক্টোবর ধরে কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। অক্টোবরে হলে এর ৪৫ দিন আগে তপশিল ঘোষণা করা হবে। ৮০ ভাগ নিশ্চিত যে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা হবে। পাশাপাশি পৌরসভা নির্বাচনের প্রস্তুতিও রয়েছে।’
নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভোটের জন্য ব্যালট বাক্স প্রস্তুত। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
