ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস

জন্মনিবন্ধন ঘাটতিতে স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকিতে

দেশে আবার বাড়ছে প্রজনন হার

জন্মনিবন্ধন ঘাটতিতে স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকিতে
×

 তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৪ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য পরিচালিত সাম্প্রতিক হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ কোটি ৯৯ লাখ শিশু। অথচ একই বয়সী শিশুদের জন্য পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ কোটি ২৬ লাখ ৬১ হাজার। দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রায় পার্থক্য প্রায় ২৮ লাখ শিশু। 

সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ৩ কোটি ১ লাখ ১৮ হাজার মানুষের জন্মনিবন্ধন হয়নি। ফলে প্রকৃত জন্মসংখ্যা ও বয়সভিত্তিক জনসংখ্যার নির্ভুল পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে না। জনসংখ্যাবিদরা বলছেন, নির্ভরযোগ্য জন্মতথ্যের অভাবে শিশুদের জন্য নেওয়া টিকাদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে। এতে বিপুলসংখ্যক শিশু প্রয়োজনীয় সেবার বাইরে থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এমন বাস্তবতায় আজ শনিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি।’

স্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, জন্মনিবন্ধনের তথ্য নির্ভুল না হওয়ায় বয়সভিত্তিক শিশু জনসংখ্যার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। ফলে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি কার্যক্রম, রোগ প্রতিরোধ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনায় বিভিন্ন উৎসের তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে একই বয়সসীমার শিশুদের জন্য নেওয়া কর্মসূচিতেও লক্ষ্যমাত্রায় বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দেয়।

জনসংখ্যাবিদদের মতে, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখে দাঁড়িয়েছে। তবে তারা বয়সভিত্তিক তথ্য দিতে পারেনি। এমন তথ্য পেতেও ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়। জন্মনিবন্ধন শুধু একটি নাগরিক সনদ নয়; এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ভিত্তি। জন্মের তথ্য নির্ভুল না হলে কত টিকা, কত ওষুধ, কত স্বাস্থ্যকর্মী বা কত বাজেট প্রয়োজন, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশুর জন্ম হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে হয়। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতাল থেকে জন্মনিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে নিবন্ধনের হার দ্রুত বাড়বে এবং জন্মসংক্রান্ত তথ্যও আরও নির্ভুল হবে।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে জন্ম, মৃত্যু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার শতভাগ নিবন্ধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে শিশুদের প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার সময় জন্মনিবন্ধন সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা টাস্কফোর্সের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি এবং গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।

ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নিবন্ধন নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জন্মনিবন্ধন কার্যকরভাবে সমন্বয় করা গেলে শুধু নিবন্ধনের হারই বাড়বে না, শিশুস্বাস্থ্য পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে। এ জন্য হাসপাতাল থেকেই জন্মনিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

নজরুল ইসলাম বলেন, জনসচেতনতার অভাব, নিবন্ধন কর্মকর্তাদের সীমিত সক্ষমতা, জনবল ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের ঘাটতি, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবার সীমিত প্রাপ্যতা এবং স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে দুর্বল সমন্বয় পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। 

অনেক সময় সার্ভার সমস্যার কারণেও সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন। এ সমস্যা সমাধানে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্যকর্মী, গ্রাম পুলিশ ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে গ্রামীণ পর্যায়ে নিবন্ধনসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দেশে আবার বাড়ছে প্রজনন হার
ইউএনএফপিএর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশের মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ২ দশমিক ১ বলা হয়েছে। তবে একই সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) অনুযায়ী, বর্তমানে টিএফআর ২ দশমিক ৪। একসময় দীর্ঘ প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ প্রজনন হার কমিয়ে ২ দশমিক ১৭-এ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেড় থেকে দুই বছর ধরে চাহিদার তুলনায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ কম থাকায় এর প্রভাব পড়েছে। 

জনসংখ্যাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান সংকট কাটাতে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন আরও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। হাসপাতালে জন্ম ও মৃত্যুর নিবন্ধনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্পণ করা হলে নিবন্ধনের হার দ্রুত বাড়বে। 

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা সমকালকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, সেটিই মোট প্রজনন হার কিছুটা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। আগের সেক্টরাল কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর নতুন কর্মসূচির অধীনে ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু করতে কিছুটা সময় লেগেছে। ফলে মাঠপর্যায়ে কিছুদিন জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট ছিল। এখন টেন্ডার মূল্যায়নের কাজ শেষ পর্যায়ে। খুব দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি। নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে আগামী ১৫ মাসের জন্য প্রয়োজনীয় পিল, কনডম, ইনজেকটেবলসহ সব ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সংগ্রহ করা হচ্ছে। এগুলোর সরবরাহ শুরু হলে সারা দেশে আর ঘাটতি থাকবে না। জন্মনিবন্ধনের বিষয়ে তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকেই নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা গেলে শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আরও সহজ হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন সমকালকে বলেন, শিশুদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার স্বাস্থ্য খাতে বড় বাজেট দিয়েছে। জন্মনিবন্ধনের জটিলতায় যাতে কোনো শিশু সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। নতুন করে সামগ্রী সরবরাহ শুরু হলে বর্তমান ঘাটতি দ্রুত দূর হবে।

 

আরও পড়ুন

×