অভিমত
সংকটের সমাধান জানা আছে, দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন
ড. ইজাজ হোসেন
ড. ইজাজ হোসেন
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের চলমান গ্যাস সংকটকে আকস্মিক বা সাময়িক সংকট বলা যাবে না। এটি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া একটি কাঠামোগত সংকট। বড় পরিসরে দেখলে প্রায় এক দশক ধরে এর প্রভাব চলছে। তবে গত তিন বছরে এই সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটি শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; শিল্প, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এই ঘাটতি নিয়েই পুরো অর্থনীতি চালানোর চেষ্টা চলছে। ফলে কোথাও এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটুক, পাইপলাইনে কারিগরি সমস্যা দেখা দিক কিংবা গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাক- যে কোনো ছোট সমস্যা মুহূর্তের মধ্যে বড় সংকটে রূপ নিচ্ছে। কারণ, পুরো ব্যবস্থাটিই এখন সীমার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
এই সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো দ্রুত আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপন করা। দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে নতুন একটি এফএসআরইউ প্রয়োজন, তা বহুদিন ধরে জানা ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সময়োপযোগী বাস্তবায়নে আমরা গতি দেখাতে পারিনি। টেন্ডার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে।
আমি মনে করি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সঠিক কাজটিও যদি ধীরগতিতে করা হয়, তবে তার সুফল পেতে অনেক দেরি হয়ে যায়।
নতুন সরকার অবশ্য কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নতুন কূপ খননের কাজ চলছে, গভীর কূপ খননের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এগুলো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের বর্তমান সংকটের তুলনায় এগুলোর বাস্তবায়নের গতি কি যথেষ্ট? আমার মনে হয় না। জ্বালানি খাতে সময়ের মূল্য অনেক বেশি। এক-দুই বছরের বিলম্বের মূল্য পুরো অর্থনীতিকে চড়া দাম দিতে হয়।
গ্যাস সংকট কমানোর আরেকটি বড় সুযোগ ছিল; সেটি হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সময়মতো উৎপাদনে আনা। এটি হলে প্রায় দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতো। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা অনেক কমে যেত। তখন বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের একটি বড় অংশ শিল্পসহ অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে দেওয়া সম্ভব হতো। সেই সুযোগ আমরা এখনও কাজে লাগাতে পারিনি।
তবে শুধু এলএনজি আমদানি বাড়ালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎসহ বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর এখনই উপযুক্ত সময়। বিশ্বের অনেক দেশ খুব অল্প সময়ে হাজার হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশও তা করতে পারে, যদি নীতিগত অগ্রাধিকার, অর্থায়ন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের সঠিক সমন্বয় থাকে।
দক্ষতার সঙ্গে জ্বালানির ব্যবহারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রায়ই নতুন সরবরাহের কথা বলি, কিন্তু বিদ্যমান জ্বালানি কতটা দক্ষভাবে ব্যবহার করছি, সেটি খেয়াল করি না। অপচয় কমাতে পারলে সীমিত সম্পদ দিয়েও অনেক বেশি সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
কেউ কেউ মনে করেন, চাহিদা কমিয়ে সংকট মোকাবিলা করা যেতে পারে। আমি এর সঙ্গে একমত নই। জ্বালানির চাহিদা বাড়ার অর্থ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়া। নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়া। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত চাহিদা পূরণের সক্ষমতা তৈরি করা।
এখন সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে শিল্প খাত। গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর প্রভাব শুধু শিল্প মালিকের ওপর পড়ে না; শ্রমিকের কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয়, নতুন বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে তার মূল্য পুরো দেশকেই দিতে হবে।
আমার মতে, সমাধানের পথ অজানা নয়। দ্রুত নতুন এফএসআরইউ স্থাপন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন জোরদার করা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত চালু করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা– এসব পদক্ষেপ একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে, যাতে পুরো জ্বালানি খাত আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টেকসই হয়।
আমার উদ্বেগ একটিই– এই সংকটকে যে মাত্রার জরুরি সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত, আমরা কি সেভাবে দেখছি? আমার পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অনেকগুলোই শুরু হয়েছে, কিন্তু গতি এখনও যথেষ্ট নয়। অথচ সময় এখন সবচেয়ে মূল্যবান। যত দেরি হবে, তত বাড়বে শিল্পের ক্ষতি, জনগণের ভোগান্তি এবং অর্থনীতির চাপ।
তাই আবারও বলব, গ্যাস সংকটের সমাধান আমাদের জানা আছে। এখন প্রয়োজন সেই সমাধানগুলো দ্রুত, সমন্বিত ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করা।
লেখক: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক
- বিষয় :
- অভিমত