ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

অদক্ষতায় শ্রমবাজারে পিছিয়ে তরুণরা

বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস আজ

অদক্ষতায় শ্রমবাজারে পিছিয়ে তরুণরা
×

 হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় চার কোটি ৭৫ লাখ মানুষ ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী। এই বিশাল যুব জনগোষ্ঠীকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জনমিতিক সুবিধা বা লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সেই সম্ভাবনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষতার ঘাটতি। ফলে অভ্যন্তরীণ শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীর সংকট তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক শ্রমবাজারেও অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ কর্মীর আধিক্যের কারণে উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। 

এ পটভূমিতে আজ বুধবার দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস’। ২০১৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ দিবসটি ঘোষণার পর ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর এটি বৈশ্বিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। মূলত প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরতেই এই আয়োজন।
বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস উপলক্ষে আলাদা বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উপলক্ষে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেশজুড়ে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, সেমিনার ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৬৮ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার তরুণ বেকার, যা শতাংশের হিসাবে ৭ দশমিক ২। উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৯ শতাংশই এই বয়সসীমার আওতাভুক্ত। অন্যদিকে, সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ‘হারনেসিং দ্য পটেনশিয়ালস অব ইয়ুথ’ শীর্ষক নীতিপত্রের তথ্য আরও আশঙ্কাজনক। সেখানে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ-তরুণী বর্তমানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা কোনো প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নেই। একই নীতিপত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্নকারীর মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব পরিসংখ্যানই দেশের শ্রমবাজারে দক্ষতার ঘাটতি ও কর্মসংস্থানের প্রকৃত সংকটকে ফুটিয়ে তোলে। তাদের মতে, সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ চাহিদা ও দক্ষতার অমিল (স্কিলস মিসম্যাচ)। অর্থাৎ, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তরুণরা যে ধরনের প্রথাগত শিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছেন, শিল্প ও সেবা খাতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে তার বড় ধরনের অমিল রয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ চাকরি পাচ্ছেন না, অন্যদিকে উৎপাদন ও শিল্প খাত দক্ষ কর্মী না পেয়ে ধুঁকছে। 

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়করণ (অটোমেশন) ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারে বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বর্তমান বাজারে একাডেমিক সনদের চেয়ে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, ডিজিটাল সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং ভাষাজ্ঞান নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় দক্ষতা উন্নয়নকে অন্যতম অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ), যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি, তৈরি পোশাক, নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল, কৃষি ও পর্যটন খাতে নানামুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সবচেয়ে বড় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (এসইআইপি) আওতায় প্রায় আট লাখ মানুষকে ১৩০টির বেশি ক্যাটেগরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। 

এত বড় উদ্যোগের পরও দেশের দক্ষ জনবলের সংকট কাটেনি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায় দেখা গেছে, তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে এখনও দক্ষ কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী তরুণের নিয়োগের পর নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে হচ্ছে, যা শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও সময় দুটিই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

দক্ষতার এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে বৈদেশিক শ্রমবাজারে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে যে বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের সিংহভাগই অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ। তারা মূলত নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কম বেতনের কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, ইতালি ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেশিন অপারেটর, কেয়ারগিভার (সেবাদানকারী), স্বাস্থ্যকর্মী ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দক্ষ কর্মীর চাহিদা তুঙ্গে। তবে আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদের অভাবে বাংলাদেশ এই বিশাল ও উচ্চ আয়ের বাজার ধরতে পারছে না। 

শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই ফিলিপাইন, ভারত কিংবা ভিয়েতনামের কর্মীদের চেয়ে বাংলাদেশি কর্মীর গড় আয় অনেক কম এবং সমসংখ্যক কর্মী পাঠিয়েও দেশ আশানুরূপ রেমিট্যান্স পাচ্ছে না।
 

আরও পড়ুন

×