ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

রামপুরায় গুলি ও হত্যা

ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
×

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ছবি: সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ২১:৫৪

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি ও দু’জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবসহ ৩ পুলিশের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে একজনকে দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও আরেক আসামির ২০ বছরের কারাদণ্ডের বিষয়টিও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন বিচারকের সাক্ষরের পর বুধবার রায়টি প্রকাশিত হয়। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান (ইতোমধ্যে চানখাঁরপুলের মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে), ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। এই তিন আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

অন্যদিকে রায়ে রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। তিনিও পলাতক। এছাড়া রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি গ্রেপ্তার আছেন। বুধবার থেকে আগামী এক মাসের মধ্যে আপিল করতে পারবেন সাজাপ্রাপ্তরা।

রায়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সমন্বিত, ব্যাপক ও পরিকল্পিত আক্রমণের অংশ। আন্দোলন দমনে রামপুরায় সংঘটিত হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধগুলো রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবেও অবহিত করা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা সমন্বিতভাবে অংশ নেন।

রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ওয়্যারলেস মেসেজের মাধ্যমে তার অধীনস্তদের উসকানি দিয়েছেন এবং এই হত্যাকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন। অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে গুলি করে দুইজনকে হত্যা করা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি টেলিফোন আলাপচারিতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন।

রায়ে আরও বলা হয়, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এবং তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমানকে নিয়ে গঠিত একটি কোর কমিটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে বৈঠক করেন। সেখানে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশনা পান এবং পরে সেই নির্দেশ পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছে পৌঁছে দেন।

ট্রাইব্যুনালের মতে, পরে হাবিবুর রহমান বেতার বার্তার মাধ্যমে ডিএমপির সদস্যদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেন।

রায়ে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর বনশ্রী এলাকায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি চালায়। এ সময় রামপুরা থানার কাছে ভাড়া বাসার গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থাকা সাত বছর বয়সী মুসা খান এবং তার দাদি মায়া ইসলাম একটি গুলিতে আহত হন। গুলিটি মুসার মাথা ভেদ করে মায়ার তলপেটে আঘাত করে। ঘটনার আগে মুসা তার দাদিকে আইসক্রিম কিনে দেওয়ার জন্য বাইরে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে মনে করে তারা পঞ্চম তলা থেকে নিচে নেমে গ্যারেজে এলে গুলিবিদ্ধ হন।

রায়ে আরও বলা হয়, ঘটনার পর ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান রামপুরা থানায় গিয়ে অভিযানে ভূমিকার জন্য ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মশিউর রহমানকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেন।

ট্রাইব্যুনাল বলেন, অভিযানের তত্ত্বাবধান করেন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) রাশেদুল ইসলাম এবং ওসি মশিউর রহমান। তারা নিজেরাই ভুক্তভোগীদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। গুলিবিদ্ধ হয়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশের নিচে আশ্রয় নেওয়া আমির হোসেনকে পরে এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার আবারও গুলি করেন।

আরও পড়ুন

×