ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

আমলাদের অন্যায্য প্রভাবের কাছে সরকার নতি স্বীকার করেছে

আমলাদের অন্যায্য প্রভাবের কাছে সরকার নতি স্বীকার করেছে
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৮

প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ির মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অর্ধেক কমাতে প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াস কোন শক্তির প্রভাবে প্রতিহত করা হয়েছে– এ প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত একশ্রেণির আমলার অন্যায্য প্রভাবের কাছে সরকার নতি স্বীকার করেছে। আমলাতন্ত্রের কাছে সরকার অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেছে।

গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘সরকারি সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে সুদমুক্ত ঋণ সুবিধায় ক্রয় করা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অর্ধেক কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করা এবং সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত ছিল। সরকারপ্রধানের এ অবস্থানের পেছনে মূল যুক্তি ছিল বৈষম্যনিরোধ ও জনগণের অর্থের অপচয় কমানো। অথচ বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে সংকীর্ণ স্বার্থে সুবিধাভোগীদের প্রভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অকার্যকর করে দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে যাচ্ছে। কোন শক্তির প্রভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ব্যয়-কৃচ্ছ্রের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হচ্ছে, তা চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি এদের সুবিধাবাদী মনস্তত্ত্ব অনুধাবন করা সরকারের জন্য জরুরি। 

তিনি আরও বলেন, ‘শুরু থেকেই তথাকথিত প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মচারীদের উদ্দেশ্যমূলক শ্রেণিবিভাগ ছিল বঞ্চনা ও বৈষম্যমূলক। মাত্র ২ হাজার ৪০০ কর্মচারীর বাইরে একই ক্যাডার ও সমমর্যাদাভুক্ত অন্যান্য সার্ভিসে কর্মরতদের জন্য যা ছিল গ্লানিকর। এ জাতীয় পক্ষপাতদুষ্ট সুযোগ সরকারি খাতে আন্তঃক্যাডার ভারসাম্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার জন্য এই সুযোগ বহাল থাকার ফলে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে একদিকে যেমন নির্দিষ্ট পদ ও পদবির অসুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে তেমনি বঞ্চিতদের স্বাভাবিক কর্মস্পৃহাকে ধ্বংস করছে। 

এ রকম একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখাসহ তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রতি মাসে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ গ্রহণ করার অধিকতর বৈষম্যমূলক চর্চা কতটা যৌক্তিক– তা ভেবে দেখার অনুরোধ করেছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার ও জ্বালানি ব্যয় বহনের সিদ্ধান্ত থেকে একশ্রেণির আমলাসহ বিভিন্ন সংস্থার যারা এ জাতীয় সুবিধা উপভোগ করে আসছেন, আদৌ কি তারা ইতিবাচক কোনো শিক্ষা নিতে পেরেছেন? জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার এরই মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের নিঃশর্ত বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্পদবিবরণী প্রকাশের বাধ্যবাধকতা আরোপের যে সুপারিশ এর আগে টিআইবি করেছে, তা-ও গৃহীত হয়নি। নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে জনগণ কতটা দুর্নীতি ও বিড়ম্বনামুক্ত সেবা পাবেন, সে প্রশ্ন রয়েছে। 

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে দেশের চলমান আর্থিক সংকটে একশ্রেণির সুবিধাবাদী সরকারি কর্মকর্তার অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা প্রদর্শন, স্বাভাবিক কোনো দাবি বা আবদারের বিষয় নয়; বরং সরকার যে আমলাতন্ত্রের কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেছে, এটা 
তারই বহিঃপ্রকাশ।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণে কেনা ব্যক্তিগত গাড়ির মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার করার বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে গত ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় অর্থ বিভাগ। তবে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তীব্র আপত্তির মুখে সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। গত ১৬ জুলাই অর্থ বিভাগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে আগের নির্দেশনার ভিত্তিতে আর কোনো কার্যক্রম না নেওয়ার কথা জানায়। ফলে আপাতত গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মাসিক ৫০ হাজার টাকাই বহাল রয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে সুদমুক্ত ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন প্রায় ৪ হাজার ২০০ কর্মকর্তা। এর মধ্যে অধিকাংশ কর্মকর্তা অবৈধভাবে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। এতে চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে ২১ কোটি টাকা। সে হিসাবে বছরে সরকারের বাড়তি খরচ হচ্ছে ২৫২ কোটি টাকা। সে হিসেবে অর্ধেক ব্যয় কমানো হলে বছরে সরকারের ১২৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। 

আরও পড়ুন

×