অপুষ্টিতে জিডিপির 8 শতাংশের বেশি ক্ষতি, বেড়েছে ত্রিমুখী সংকট
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে অপুষ্টি এখন শুধু স্বল্পপুষ্টি বা ভিটামিন ঘাটতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে বাড়ছে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার সমস্যা। ফলে দেশ এখন পুষ্টির ‘ডাবল বার্ডেন’ পেরিয়ে ‘ট্রিপল বার্ডেন’-এর মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টির কারণে দেশের অর্থনীতিতে বছরে জিডিপির ৮ শতাংশের বেশি ক্ষতি হচ্ছে। তবে পুষ্টি খাতে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগ করলে দীর্ঘ মেয়াদে ২৩ টাকারও বেশি অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব।
গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ আয়োজিত ‘বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় পুষ্টি কার্যক্রমের সংযুক্তিকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের প্রধান সাইকা সিরাজ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সচেতনতা কার্যক্রম চললেও দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের খাদ্য এখনও শর্করা বা চালনির্ভর। চর, হাওর ও বস্তির মতো প্রান্তিক এলাকায় পুষ্টিসেবাও দুর্বল। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ, পোশাকশিল্পের শ্রমিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বয়স্কদের পুষ্টির চাহিদাও পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) জোরদার এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন এবং মাতৃদুগ্ধ বিকল্প আইন বাস্তবায়নে কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে বন্যাকবলিত আশ্রয়কেন্দ্রে গুঁড়া দুধ বিতরণ বন্ধ রেখে মাতৃদুগ্ধ পানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে শনাক্ত হওয়া তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের তথ্য এনজিও এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে সরকারি ডেটাবেজে যুক্ত করতে হবে। এতে একই শিশুর তথ্য একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সমস্যা কমার পাশাপাশি সেবা আরও কার্যকর হবে।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর খর্বতা ছয় মাস বয়সের পর নয়, বরং গর্ভকালীনই শুরু হয়। মায়ের অপুষ্টি, বিশেষ করে কৈশোরের অপুষ্টি এর বড় কারণ।
তিনি বলেন, অস্বাস্থ্যকর পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির কারণে শিশুদের অন্ত্রে যে পরিবেশগত ক্ষতি হয়, তা খর্বতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশের বদলে ৩ থেকে ৫ শতাংশ বিনিয়োগ করা গেলে দেশে খর্বতার হার ২৪ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। ড. তাহমিদ আহমেদ আরও জানান, বর্তমানে প্রায় চার লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। তবে তাদের মধ্যে মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশের হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। বাকিদের কমিউনিটিভিত্তিক সেবার মাধ্যমেই সুস্থ করা সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ১৯৭৪ সালে জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি শুরু হলেও ২০২৬ সালেও বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। তিনি জানান, দেশে শিশুদের কৃশতার হার ১৩ শতাংশ, রক্তস্বল্পতা ৫৩ শতাংশ এবং স্থূলতার হার ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা এখনও গ্রাম পর্যায়ে যথাযথভাবে পৌঁছায়নি।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এতদিন চিকিৎসাকেন্দ্রিক ছিল। এখন প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের ওয়ার্ডে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট গড়ে তোলা হবে। বর্তমানে কর্মরত ৪৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে আরও এক লাখ নতুন কর্মী যুক্ত হয়ে প্রায় এক লাখ ৫২ হাজার হবে। এসব স্বাস্থ্যকর্মী নিয়মিত বাড়ি গিয়ে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, মানসিক স্বাস্থ্য, শিশুর ওজন ও উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করবেন। প্রতিটি নাগরিককে দেওয়া হবে একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড। এর মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় হাসপাতালে ভিড় এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় কমানোর আশা করছে সরকার।
- বিষয় :
- অপুষ্টি