ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গুমের তদন্তে অভিযুক্তের হাতেই ক্ষমতা, স্বাধীন কমিশনের আশা অধরা: টিআইবি

গুমের তদন্তে অভিযুক্তের হাতেই ক্ষমতা, স্বাধীন কমিশনের আশা অধরা: টিআইবি
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:২০

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত দুটি প্রস্তাবিত আইনে কিছু ইতিবাচক সংশোধন এলেও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মৌলিক ঘাটতি দূর হয়নি বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। 

সংস্থাটি বলেছে, বিশেষ করে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের কর্তৃত্ব কার্যত অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের হাতেই থাকছে। ফলে স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ নিয়ে উদ্বেগ জানায় টিআইবি। সংস্থাটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ চূড়ান্তভাবে পাসের আগে সংসদে প্রতিটি ধারা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সব সদস্যের অর্থবহ আলোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশন সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হবে না– এমন সুস্পষ্ট বিধান না থাকায় এর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। একই সঙ্গে চাকরিরত সরকারি কর্মচারীকে প্রেষণ, লিয়েন বা অবৈতনিক ছুটিতে কমিশনার হওয়ার সুযোগ এবং বাছাই কমিটিতে স্পিকার, দুই মন্ত্রী, সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখার প্রস্তাব নির্বাহী বিভাগ ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবের ঝুঁকি বাড়াবে।

তিনি বলেন, কমিশনের মোট জনবলের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি কর্মচারী প্রেষণে নিয়োগ এবং ব্যয় ও বরাদ্দ ব্যবহারে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক স্বাধীনতার সুরক্ষা না থাকায় ‘স্বাধীন’ মানবাধিকার কমিশনের প্রত্যাশা অধরাই থেকে যাচ্ছে।

অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছেই তদন্তের প্রতিবেদন
টিআইবির সবচেয়ে বড় আপত্তি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের ১৯ ধারা নিয়ে। সংস্থাটির দাবি, শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে কমিশন নিজে সরাসরি অনুসন্ধান ও তদন্ত না করে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাইবে। এতে তদন্তের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশনের তদন্তের এখতিয়ার সংকুচিত করে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদননির্ভর করা হয়েছে। এ ব্যবস্থা ২০০৯ সালের আইনের তুলনায়ও দুর্বল এবং প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইউনিটের নিয়মিত ও পূর্বঘোষণা ছাড়া পরিদর্শনযোগ্য স্থানের তালিকা থেকে ‘সামরিক আটককেন্দ্র’ বাদ দেওয়াকেও উদ্বেগজনক বলে মনে করছে টিআইবি। পাশাপাশি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পক্ষে আইনি সহায়তা, মানবাধিকারবিষয়ক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলের সঙ্গে আইনের সামঞ্জস্য পরীক্ষা এবং মানবাধিকার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাজ কমিশনের কার্যাবলি থেকে সংকুচিত করার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে আদিবাসী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বাধ্যবাধকতা, ঋণখেলাপিকে কমিশনার হওয়ার অযোগ্য করা এবং সামরিক ছাড়া অন্য আটককেন্দ্র পরিদর্শনে পূর্বানুমোদনের শর্ত বাদ দেওয়ার প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে টিআইবি।

গুমের তদন্তেও স্বার্থের দ্বন্দ্বের আশঙ্কা
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলেও মৌলিক দুর্বলতা রয়ে গেছে বলে মনে করছে টিআইবি। সংস্থাটির ভাষ্য, বিলের ধারা ৪-এর লিখন পুনর্বিন্যাস ছাড়া স্বাধীন তদন্ত, জবাবদিহি ও ভুক্তভোগীর অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটি কার্যত মৌলিক কোনো সংশোধনের সুপারিশ করেনি।

বিলের ১৪(৩) ধারায় অভিযুক্ত বাহিনীকে নিজ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত থেকে বিরত রাখার কথা বলা হলেও অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের হাতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। টিআইবির প্রশ্ন, অতীতে গুমের ঘটনায় বিভিন্ন শৃঙ্খলা, পুলিশ, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় একই প্রাতিষ্ঠানিক বলয়ের বাইরে থেকে তদন্ত কতটা স্বাধীন হবে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবে দুর্বল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত হলে শুধু ন্যায়বিচারই ব্যাহত হবে না; ভুক্তভোগীরা গুমের শিকার হিসেবে স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের সম্পত্তি ব্যবহার ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন।

জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততাও সংজ্ঞায় আনার দাবি
গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ আইসিপিপিইডি অনুযায়ী গুমের সংজ্ঞা আরও পূর্ণাঙ্গ করার দাবি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, সরকারি কর্মচারী ও শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া বিলের ১৫ ধারায় অধস্তন তদন্তকারীর অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে কার্যধারা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। তাদের মতে, এতে অভিযুক্তদের ঢালাও দায়মুক্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিলের ১৬ ধারায় ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বাদ পড়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। ওই বিধানে গুমের শিকার ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া বা তাঁর পরিণতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়া এবং পরিবারকে নিয়মিত অগ্রগতি জানানোর বিষয়টি ছিল।

‘মিথ্যা অভিযোগে’ শাস্তি নিয়েও উদ্বেগ
টিআইবির দাবি, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় গুম-সংক্রান্ত অপরাধের সাজাও কমানো হয়েছে। গুমের অপরাধের ন্যূনতম সাজা তিন বছর হলেও ‘মিথ্যা বা হয়রানিমূলক’ অভিযোগের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, তদন্ত ব্যবস্থাই যখন স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের ঝুঁকিতে রয়েছে, তখন যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে উল্টো অভিযোগকারী পরিবারকেই দায়ী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার অভিযোগ জানানো ও ন্যায়বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে ভীত হয়ে পড়তে পারে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনা ছিল দুটি বিলের মৌলিক দুর্বলতা সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও অংশীজনদের তুলে ধরা মূল কৌশলগত উদ্বেগগুলো বহাল রয়েছে। তাই বিল দুটি তড়িঘড়ি কণ্ঠভোটে পাস না করে প্রতিটি ধারা ও সংশোধনী নিয়ে সংসদের সব সদস্যের অর্থবহ আলোচনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্যারিস নীতিমালা, আইসিপিপিইডি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এবং ভুক্তভোগীদের অধিকার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংশোধন না করে বিল দুটি পাস করা হলে মানবাধিকার সুরক্ষায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার দায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ওপর বর্তাবে।

আরও পড়ুন

×