ঢাকা বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

জিপিএ ৩-এর নিচে অর্ধেক শিক্ষার্থী, বৈষম্যের ইঙ্গিত

জিপিএ ৩-এর নিচে অর্ধেক শিক্ষার্থী, বৈষম্যের ইঙ্গিত
×

 সাব্বির নেওয়াজ

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থীদের অর্ধেক জিপিএ ৩-এর নিচে পেয়েছে। এমন খারাপ ফলের পেছনে শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান বৈষম্যের বড় প্রভাব আছে বলে মনে করছেন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা এবং শিক্ষাবিদরা। ফলে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী খারাপ ফল নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে যাচ্ছে। 

গত সোমবার প্রকাশিত ফলের তথ্য অনুযায়ী, এবার ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন পাস করেছে। ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরীক্ষার্থীদের ৫০.৩৪ শতাংশ জিপিএ ৩-এর কম পেয়েছে। 

বিশ্লেষণে দেখা যায়, জিপিএ ৪-এর নিচে পেয়েছে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছয় লাখ ৭৮ হাজার ৫২৩ জন, যা মোট পাসের প্রায় ৬০ শতাংশ। আর জিপিএ ৪ বা এর বেশি পেয়েছে চার লাখ ৬০ হাজার ৩৫৪ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাস করা শিক্ষার্থীদের বড় অংশের প্রাপ্ত জিপিএ তুলনামূলক কম হওয়া শিক্ষার গুণগত মানের দিকে ইঙ্গিত করছে। ইংরেজি ও গণিতে খারাপ করা এর একটা উদাহরণ।
এবার শুধু পাসের হারই কমেনি; টানা চতুর্থ বছরের মতো কমেছে জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। এর মধ্যে মানবিক বিভাগে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। একই সঙ্গে শতভাগ ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক বছরে দ্বিগুণের বেশি হয়ে ৩১২-তে পৌঁছেছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ কেবল পরীক্ষার ফল নয়; এটি শিক্ষার মান, ভালো শিক্ষকের সংকট, শিক্ষায় গ্রাম-শহরের মধ্যে বৈষম্য, দারিদ্র্য বৃদ্ধিসহ বিদ্যমান সামাজিক সংকটেরও নির্দেশক। 
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ছয় হাজার ৯ জন। এর মধ্যে ঢাকা বোর্ডে সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার ২৫৩, রাজশাহীতে ১৬ হাজার ১১৩ এবং দিনাজপুরে ১৩ হাজার ৬৩৯ জন। মাদ্রাসা বোর্ডে জিপিএ ৫ পেয়েছে ছয় হাজার ৭১৬ এবং কারিগরি বোর্ডে তিন হাজার ৯৫১ জন।

টানা চতুর্থ বছর কমলো জিপিএ ৫
এ বছর জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ শিক্ষার্থী। গত বছর এ সংখ্যা ছিল এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন। চার বছরের ধারাবাহিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে জিপিএ ৫ পেয়েছিল দুই লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় এক লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮; ২০২৪ সালে এক লাখ ৮২ হাজার ১২৯; ২০২৫ সালে এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ এবং ২০২৬ সালে নেমে এসেছে এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬-এ।

এবার মোট পরীক্ষার্থীর মাত্র ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ জিপিএ ৫ পেয়েছে। জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ৬৩ হাজার ৮৯৬ এবং ছাত্র ৫২ হাজার ৭৮০। অর্থাৎ মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে।

বড় বিপর্যয় মানবিক বিভাগে
ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে যেখানে বিজ্ঞান বিভাগে এবার পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ, সেখানে মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে। মানবিক বিভাগে সর্বোচ্চ পাসের হার ঢাকা বোর্ডে ৫৫ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন দিনাজপুর বোর্ডে ৩৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

জানতে চাইলে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালাম সমকালকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের খাতার যথার্থ মূল্যায়ন হয়েছে এ বছর। পাস বেশি দেখানোর প্রবণতা থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার কারণে পাসের হার কমলেও ফল সন্তোষজনক। তিনি বলেন, ‘তবে মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।’

দরিদ্র ঘরের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে পিছিয়ে
শিক্ষা বোর্ডগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর জিপিএ ২ থেকে ৩ কিংবা ন্যূনতম জিপিএ নিয়ে যারা পাস করেছে, তাদের বড় অংশ গ্রামের। এর মধ্যে দরিদ্র এলাকায় এমন ফল বেশি দাবি করে তারা এ বিষয়ে আরও বিশ্লেষণের পক্ষে মত দিয়েছেন। 

রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক আজমল হোসেন আজিম সমকালকে বলন, গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভালো মানের বিদ্যালয়, গণিত ও ইংরেজির দক্ষ শিক্ষক কিংবা কোচিংয়ের সুযোগ পায় না। পারিবারিক দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম এবং বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি তাদের শিক্ষাজীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। পরীক্ষার ফলে তার প্রভাব পড়ছে।
শতভাগ ফেল করা ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের অনেকটাতেই পরীক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক বেশি থাকলেও একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে ২২৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা বোর্ডের অধীন। কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার শ্যামপুর এখলাছিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় ১৫ শিক্ষক থাকলেও ১০ পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করেনি। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়ে ৯ জন শিক্ষক থাকলেও একমাত্র পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। কুড়িগ্রামের তালতলা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১২ শিক্ষক ও ১২ পরীক্ষার্থী থাকলেও পাস করেনি কেউ। জামালপুরের কদমতলী কারিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ১১ শিক্ষক থাকলেও প্রথমবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তিন শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর একাধিক প্রধান শিক্ষক বলেছেন, গণিত শিক্ষকের সংকট, শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি, দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ ও মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীরা খারাপ ফল করেছে।

জানতে চাইলে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, শিক্ষক সংকট দূর করা এবং গ্রাম-শহরের শিক্ষাবৈষম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, যে ৩১২ প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি তাদের নিয়ে গবেষণা করে কারণ চিহ্নিত করতে হবে। সমাধানের পথে এটা ভালো পদক্ষেপ হতে পারে। 

 

আরও পড়ুন

×