ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের প্রবেশমুখে ইজারা দিয়ে গাড়ি পার্কিং 

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের প্রবেশমুখে ইজারা দিয়ে গাড়ি পার্কিং 
×

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। শুক্রবার তোলা- সমকাল

অমরেশ রায়

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৪০ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৪৬

রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবন এখন অনেকটাই ধ্বংসস্তূপ। সেখানে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের কিছু অবশিষ্ট নেই। তবে আগুনে পুড়ে যাওয়া নারিকেল ও আম গাছে পাতা গজিয়েছে। পাশাপাশি অনেক লতাপাতা জন্মেছে। ভবনের আশপাশ তাঁরকাটার বেষ্টনীতে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। 

এ ছাড়া ধানমন্ডি লেকসংলগ্ন প্রধান সড়ক হয়ে ৩২ নম্বর সড়কে ঢুকতেই রাস্তার ওপর সারি সারি গাড়ি পার্ক করে রাখা। সড়কে ঢোকার দুই পাশের প্রবেশমুখেই পুলিশের ব্যারিকেড। গত মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু ভবন এলাকা সরেজমিন ঘুরে এই চিত্র পাওয়া গেছে। ৩২ নম্বর সড়কের দুই পাশের প্রবেশমুখে ব্যারিকেডের পাশাপাশি তাঁবু গেড়ে প্রহরায় থাকছে ধানমন্ডি থানার একাধিক দল। 

সরেজমিন দেখা যায়, ধানমন্ডি লেকসংলগ্ন প্রধান সড়ক (আগে রাসেল স্কয়ার হিসেবে পরিচিত ছিল) হয়ে ৩২ নম্বর সড়কে ঢুকতেই রাস্তার ওপর সারি সারি গাড়ি পার্ক করা। ফুটপাত ও লেকসংলগ্ন বাঁধানো চত্বরে আরও অনেক গাড়ি পার্ক করা। সেখানে বিদ্যুতের দুটি পোল ও পুলিশ ব্যারিকেডের ওপর এবং উল্টো পাশের দেয়ালে তিনটি ব্যানার লাগানো। ব্যানারগুলোর লেখা থেকে জানা গেল, ৩২ নম্বর সড়কের প্রবেশমুখের লেক চত্বরটি ‘গাড়ি পার্কিং’-এর জন্য ‘জে অ্যান্ড কো ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দর্শনার্থীর অভিযোগ, বঙ্গবন্ধু ভবনে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করতেই এই গাড়ি পার্কিংয়ের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। 

গাড়ি পার্কিংয়ের ইজারাদার প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে ‘সার্বিক তত্ত্বাবধানকারী’ পরিচয় দেওয়া মো. পলাশ আহম্মেদ টেলিফোনে সমকালকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে বৈধ ইজারা নিয়ে গত তিন মাস ধরে তারা সেখানে ‘গাড়ি পার্কিং’-এর কাজ পরিচালনা করছেন। ধানমন্ডি লেক ও লেকসংলগ্ন ২ নম্বর সেক্টর এলাকায় তাদের এই কার্যক্রম চালানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। 

শুধু লেকসংলগ্ন এলাকা ইজারা পেলেও ৩২ নম্বর সড়কের ওপর এবং ফুটপাতে কেন গাড়ি রাখা হচ্ছে– জানতে চাইলে পলাশ আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা শুধু লেক-সংলগ্ন এলাকায় আমাদের কাজ করছি। তবে রাস্তা ও ফুটপাতের ওপর কারা গাড়ি রাখছে, সেটা আমাদের জানা নেই। হয়তোবা ফাঁকা পেয়ে কেউ কেউ রাস্তার ওপর গাড়ি রেখে থাকতে পারে। এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা বঙ্গবন্ধু ভবনে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। সেদিন বিকেল ৪টা থেকে ভবনটির ভেতর থাকা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রায় সব স্মৃতিচিহ্ন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সেখানে থাকা মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ স্মৃতিচিহ্নসহ বই ও কাগজপত্র এবং মূল্যবান সামগ্রী পোড়ানো হয় অথবা লুটপাট করা হয়। পাশাপাশি ‘বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টে’র কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত আরও তিনটি বহুতল ভবনে ভাঙচুর করা হয়। ওই দিন বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে ধানমন্ডি লেকসংলগ্ন খোলা চত্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি এবং বই ও স্মারক বিক্রির স্টলসহ অন্যান্য স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু ভবন-সংলগ্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন সান্তুর রেস্টুরেন্টেও ভাঙচুরের পর আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ভবনের সামনে পার্ক করা বেশ কয়েকটি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরদিন ৬ আগস্ট সকালে আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ও আশপাশের ভবনসহ সান্তুর রেস্টুরেন্ট থেকে কমপক্ষে চারটি দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করেন। 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বঙ্গবন্ধু ভবনে আরেক দফা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়। সেই সময় এক্সক্যাভেটর (খননযন্ত্র), ক্রেন ও বুলডোজার এনে বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সামনে-পেছনের তিনটি ভবনের অবশিষ্ট অংশ, সামনের উঁচু দেয়াল ও লোহার গেটগুলোও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরের তিন-চার দিন সেখানে হাতুড়ি, শাবল দিয়ে ভাঙাভাঙি ও লুটপাট চলে। 

সরেজমিন ঘুরে আরও দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনের সড়কের ফুটপাত ঘেঁষে গজানো গাছ ও লতাপাতায় পুরো এলাকা অনেকটা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। কেউ যেন ভেতরে ঢুকতে না পারে, সেজন্য গাছপালা কাঁটাতার দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। গাছপালায় ফাঁক দিয়ে যতটুকু দেখা গেল তা হচ্ছে– বিধ্বস্ত বঙ্গবন্ধু ভবনের তিনতলার কংক্রিটের কাঠামোটা শুধু দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকেও আগুনে পোড়া ভবনটির ধ্বংসের চিহ্ন চোখে পড়ে। বঙ্গবন্ধু ভবনের বাঁ পাশের চারতলা ভবনটিরও প্রায় একই রকম অবস্থা। পেছনের ছয়তলা ভবনটিকেও ভাঙা অবস্থায় দেখা যায়। 

আরেক দিকে ৩২ নম্বর সড়কের ধানমন্ডি লেকসংলগ্ন শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি ও শ্রদ্ধা নিবেদনের বেদির চিহ্নও পাওয়া যায়নি। বেদির সামনের কাঠামোটা ধ্বংসের চিহ্ন হয়ে পড়ে আছে। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের ভেঙে ফেলা গেটসংলগ্ন শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতির অস্তিত্বও মুছে গেছে। 

একটু এগিয়ে লেকসংলগ্ন খোলা জায়গায় আরেকটি ‘স্মৃতিফলক’ দেখা গেল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়া হোটেলের বাবুর্চি কামাল হোসেন স্মরণে এই স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়। তবে এটা কারা স্থাপন করেছে, তা আশপাশে খোঁজ নিয়েও জানা যায়নি। 

আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনও অনেকে বঙ্গবন্ধু ভবন দেখতে আসেন। কেউ কেউ আসেন শ্রদ্ধা জানাতে। ৩২ নম্বর সড়ক থেকে উঁকি দিয়ে অনেকে ভবনের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করেন তারা। লেকসংলগ্ন শ্রদ্ধা নিবেদনের বেদিসহ আশপাশের এলাকায়ও যান তারা। তবে পুলিশের চোখ এড়িয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করলেই জেরার মুখে পড়তে হয়।

বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বরত একজন পুলিশ কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানান, ধানমন্ডি থানার পুলিশ সদস্যরা বঙ্গবন্ধু ভবনের নিরাপত্তায় কাজ করছেন। দিনরাত সেখানে পাহাড়া দেন তারা। ভবনটি নিয়ে প্রশাসনের আর কোনো চিন্তাভাবনা রয়েছে কি না এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি ভবন ঘিরে এমন কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণ জানতে চাইলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিলেন তিনি।

আরও পড়ুন

×