ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

সীতাকুণ্ডে এলএনজি জাহাজে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু

ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই থেমে গেল রানা মিয়ার জীবন

ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই থেমে গেল রানা মিয়ার জীবন
×

নিহত রানার মায়ের আহাজারি। ছবি- সমকাল

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:৪৫

অভাবের সংসারে একটু স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখেছিলেন রানা মিয়া। লেখাপড়া শেষ করে পরিবারের হাল ধরবেন, বাবা-মায়ের কষ্ট কমাবেন এমন স্বপ্নই ছিল তাঁর। কিন্তু পরিবারের সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই বিষাক্ত গ্যাস কেড়ে নিল ২২ বছর বয়সী রানার প্রাণ।

শুক্রবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নয় শ্রমিক নিহত হন। তাঁদের একজন গাইবান্ধা সদর উপজেলার কুপতলা ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামের রানা মিয়া।

রানা ছিলেন কৃষক হারুন মিয়া ও মনোয়ারা বেগম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে ছোট। দুই ছেলে ও এক মেয়ের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। বাবা জমিজমাহীন কৃষক। কষ্টের মধ্যেও সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছেন তিনি।

রানার বড় ভাই মোনারুল চট্টগ্রামের আবুল খায়ের স্টিল মিলে চাকরি করতেন। রানা নিজেও সেখানে কাজ করতেন। কিন্তু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সম্প্রতি তিনি সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে কাজে যোগ দেন।

পরিবারের আশা ছিল, দুই ভাই মিলে সংসারের হাল ধরবেন। অভাব-অনটন ধীরে ধীরে কেটে যাবে। কিন্তু সেই স্বপ্নই এখন পরিণত হয়েছে কান্নায়।

কুপতলার গোডাউন বাজারসংলগ্ন উত্তরপাড়া গ্রামে রানাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে পরিবেশ। কেউ বুক চাপড়ে কাঁদছেন, কেউ রানার ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন।

সন্তান হারিয়ে শোকে পাথর মা মনোয়ারা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বড় ছেলে বিয়ে করি আলাদা খায়। সংসার চালাতো ছোট ছেলে রানা। সেই ব্যাটাক ওমরা কারখানাত নিয়ে যায়া মারি ফেলালো। আমি আমার সন্তানকে ফেরত চাই। কয়েকদিন আগেই বাড়িত আসছিল। মোর বাওয়ার (ছেলে) সাথে আর দেখা হবে না। হামরা এখন কিভাবে বাচি থাকমু? 

রানার বন্ধু ও প্রতিবেশী তয়ন ইসলাম বলেন, ‘আমি আর রানা একসঙ্গে লেখাপড়া করতাম। ২০২১ সালে সে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করে। পরে সাদুল্লাপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। গাইবান্ধা সরকারি কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হতে কিছুদিন আগেই বাড়িতে এসেছিল। এভাবে সে মারা যাবে, ভাবতেও পারছি না।’

রানার বাবা হারুন মিয়াও এখন দিশেহারা। তিনি বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে বড় ছেলের বিয়ে হয়েছে। অভাবের কারণে পড়ালেখা শেষ করার আগেই সংসারের হাল ধরতে চট্টগ্রামে চাকরি নেয় রানা। ছোট ছেলে রানাই সংসার চালাত। আমি গরিব মানুষ, জমিজমা নেই। রানার মৃত্যুতে আমি একেবারে শেষ হয়ে গেলাম। সংসারের হাল ধরার মতো আর কেউ রইল না। আমি সরকারের কাছে কারখানার মালিকের বিচার দাবি করছি।’

রানার চাচা জামিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, যে কারখানায় রানা কাজ করতেন, সেখানে আগে থেকেই ত্রুটি ছিল। ত্রুটি সারানো ছাড়াই শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। এ কারণেই এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচার দাবি করছি।

স্থানীয় প্রবীণ ইউপি সদস্য আব্দুল কাশেম সরকার বলেন, রানা ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান। তাঁর বাবা হারুন মিয়া অভাবের মধ্যেও তিন সন্তানকে লেখাপড়া করিয়েছেন। পরিবারের স্বপ্ন ছিল রানা ও তাঁর বড় ভাই মিলে সংসারের হাল ধরবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।

গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক বলেন, নিহত রানার পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পরিবারটিকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

আরও পড়ুন

×