ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

নির্মাতা থেকে জাইনিন হয়ে উঠলেন সিনেমার প্রধান চরিত্র

নির্মাতা থেকে জাইনিন হয়ে উঠলেন সিনেমার প্রধান চরিত্র
×

জাইনিন চৌধুরী করিম

অনিন্দ্য মামুন

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:০৯ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:১২

কিছু গল্প পরিকল্পনা করে লেখা হয় না, গল্প নিজেই তার পথ খুঁজে নেয়। জাইনিন চৌধুরী করিমের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ হয়ে ওঠার গল্পটিও তেমন। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে নয়; বরং ক্যামেরার পেছনে কাজ করার আগ্রহ থেকেই রুবাইয়াত হোসেনের সিনেমাটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। অথচ সেই গল্পই তাঁকে নিয়ে গেল পর্দার কেন্দ্রীয় চরিত্রে। সহকারী পরিচালক থেকে হয়ে উঠলেন সিনেমার প্রধান চরিত্র।

রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন ইতিহাস লিখেছে। দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে এই মর্যাদাপূর্ণ উৎসবের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার খবর প্রকাশের পর থেকেই সিনেমাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি কৌতূহল।

টরন্টো আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও অংশ নিচ্ছে সিনেমাটি। ফলে সিনেমাটির সঙ্গে উঠে এসেছে এর অন্যতম অভিনেত্রী জাইনিনের নাম। সিনেমায় যে চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন, তার নামও জাইনিন।

সহকারী থেকে যেভাবে কেন্দ্রীয় চরিত্রে
জাইনিনের সঙ্গে রুবাইয়াতের পরিচয় যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের স্মিথ কলেজের সূত্রে। দুজনই সেখানে পড়াশোনা করেছেন, যদিও সময়টা ভিন্ন। জাইনিনের এক সাবেক অধ্যাপক ই-মেইলের মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দেন।

উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশি সিনেমায় ‘মেল গেজ’ বা পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণাপত্রে একসঙ্গে কাজ করা। কিন্তু প্রথম সাক্ষাতেই আলাপ গড়ায় অন্যদিকে। তখন নিজের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রুবাইয়াত। কথায় কথায় জাইনিনকে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেন। সিনেমার সেটে থেকে পুরো প্রক্রিয়া কাছ থেকে দেখার সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাননি তিনি।

অভিনেত্রী বলেন ‘একটি সত্যিকারের চলচ্চিত্রের সেটে থেকে পুরো প্রক্রিয়াটি কাছ থেকে দেখার সুযোগ-আমি কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চাইনি’। সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর চিত্রনাট্যের খসড়াও পড়তেন তিনি। দিতেন মতামত, চরিত্র নির্মাণ নিয়ে করতেন আলোচনা।

এর কয়েক মাস পর রুবাইয়াত প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি চরিত্রটির জন্য অডিশন দিতে চাও?’ জাইনিন অবাক—‘আমি?’ কারণ চলচ্চিত্রের নায়িকা হওয়ার পরিকল্পনা কখনোই ছিল না তাঁর। তবুও অডিশন দেন। ভেবেছিলেন, অভিনয়ে সুযোগ না পেলেও সহকারী পরিচালক হিসেবে তো থাকবেনই। কিন্তু একদিন প্রোডাকশন মিটিংয়ে সবাই দায়িত্ব পেলেও জাইনিন কোনো দায়িত্ব পেলেন না। পরে জানতে পারেন, তাঁর জায়গায় নতুন সহকারী পরিচালক নেওয়া হয়েছে। পরদিন রুবাইয়াত ফোন করে জানিয়ে দেন-প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন জাইনিন।

প্রচলিত নায়িকা ধারণার বাইরে
প্রচলিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞায় নিজেকে কখনোই নায়িকা হিসেবে ভাবেননি জাইনিন। ‘আমি লম্বা নই, ফর্সা নই, খুব রোগাও নই। আমি সাধারণ একজন মানুষ। আমার চরিত্রটিও নিজের ওজন নিয়ে সংগ্রাম করছে, নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করছে, বলেন জাইনিন। 

সমাজের তৈরি সৌন্দর্যের মানদণ্ডে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চাপই সিনেমাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চরিত্রটি কখনো সাজে, কখনো থাকে মেকআপহীন, কখনো কাঁদে, কখনো এলোমেলো। জাইনিনের কাছে এই বহুরূপী উপস্থিতিই চরিত্রটির সৌন্দর্য। অভিনয়ের পাশাপাশি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত আজমেরী হক বাঁধন, রিকিতা নন্দিনী শিমু ও সুনেরাহ বিনতে কামালের সঙ্গে কাজ করাও ছিল বড় অভিজ্ঞতা। শুটিংয়ের আগে বাঁধন তাঁকে বলেছিলেন, “তোমাকে দেখতে কেমন লাগছ, সেটা নিয়ে ভেবো না। এটা তুমি নও, এটা তোমার চরিত্র। শুধু নিজের সেরাটা দাও।’ এই কথাই আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছিল জাইনিনের।

ছিল অদৃশ্য চাপ
ঢাকার ঐতিহাসিক সৌন্দর্যচর্চা প্রতিষ্ঠান মেফেয়ারকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর গল্প। বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়া এক তরুণীকে কেন্দ্র করে সৌন্দর্য, স্মৃতি, বিশ্বাস ও ভয় মিশে তৈরি হয় এক অস্বস্তিকর জগৎ। চরিত্রটিকে তাড়া করে বেড়ায় এক কনের ভূত—যে নিজেও একসময় ‘নিখুঁত নারী’ হওয়ার সামাজিক চাপে পিষ্ট হয়েছিল। জাইনিনের ভাষায়, সেই ভূত আসলে এমন এক আদর্শের প্রতীক, যেটা নারী সারাক্ষণ অর্জন করতে চায়, কিন্তু কখনোই পুরোপুরি হয়ে উঠতে পারে না।

চরিত্রের বাস্তবতা বুঝতে জাইনিন নিজেও নিয়েছিলেন ব্রাইডাল ট্রিটমেন্ট। বডি স্ক্রাব, ম্যাসাজ, ভ্রু থ্রেডিং থেকে শুরু করে ব্রাইডাল মেকআপ-সবকিছুর অভিজ্ঞতা নিয়েছেন তিনি। এমনকি স্বাভাবিক ত্বকের রঙের চেয়ে কয়েক শেড হালকা ফাউন্ডেশনও ব্যবহার করা হয়েছে। ‘আমরা সেই চাপটিই দেখাতে চেয়েছি। প্রশ্ন তুলতে চেয়েছি-কেন বিয়েকে এখনো একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়?’

বাংলাদেশের অন্য এক গল্প
নামটা ইংরেজি হলেও  ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ পুরোপুরি বাংলাদেশের গল্পের সিনেমা বললেন জাইনিন। ঢাকার ঐতিহাসিক মেফেয়ার সৌন্দর্যচর্চা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নির্মিত সিনেমাটি। এর গল্পে বিয়ে, সৌন্দর্য, স্মৃতি, ভয় ও বিশ্বাস মিশে তৈরি হয়েছে এক অস্বস্তিকর জগৎ।  অভিনেত্রী  বলেন, এটি আমার প্রথম সিনেমা। আমার কাছে এটি খুবই বিশেষ একটি গল্প। আন্তর্জাতিক দর্শকেরা বাংলাদেশের গল্প বলতে অনেক সময় দারিদ্র্য ও কষ্টের গল্প প্রত্যাশা করেন। কিন্তু এই সিনেমায় আমরা বিলাসিতা ও আধুনিকতার একটি দিক দেখিয়েছি। একই সঙ্গে দেখিয়েছি, সেই চাকচিক্যের নিচেও কীভাবে সহিংসতা লুকিয়ে থাকতে পারে। 

আরও পড়ুন

×