ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নির্মাণকাজের বিলম্বে ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে

নির্মাণকাজের বিলম্বে ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে
×

 মেসবাহুল হক 

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৯ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

যশোর, কক্সবাজার, পাবনা ও নোয়াখালী জেলায় ২০১৮ সালে চারটি ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ওই বছরের জুলাই মাসে। তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে বারবার দরপত্র বাতিলসহ নানা কারণে আট বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ হয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ। দ্বিতীয় দফায় সংশোধন প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। 
২০১৮ সালে ওই চার জেলায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় দুই হাজার ১০৩ কোটি দুই লাখ টাকা। ২০২১ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। শেষ না হওয়ায় তখন প্রকল্প প্রস্তাব প্রথম দফা সংশোধন করা হয়। বর্তমানে দ্বিতীয় সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেওয়া হয়েছে। 

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব ৫০০ বেডেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অ্যান্ড এনসিলারি বিল্ডিং ইন যশোর, কক্সবাজার, পাবনা অ্যান্ড নোয়াখালী’ শীর্ষক প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কমিশনে পাঠানো হয়েছে। 

২০১৮ সালে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় দুই হাজার ১০৩ কোটি টাকা। ২০২১ সালে প্রথম সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে তিন হাজার ৪১৭ কোটি টাকা করা হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এবার দ্বিতীয় সংশোধনীতে ব্যয় আরও ৫৫৫ কোটি টাকা বাড়িয়ে তিন হাজার ৯৭২ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ২৭ শতাংশ। 

পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণের চুক্তি হয় ২০২৪ সালের ১৯ জুন। যশোর ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভবন নির্মাণের চুক্তি হয় ২০২৩ সালের ২৬ জুন। নোয়াখালীতে ১০ তলা হাসপাতাল ভবনের পরবর্তী পর্যায়ের কাজের জন্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে হাসপাতাল ভবনগুলো হস্তান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পুরো প্রকল্প শেষ করতে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত সময় লাগবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ সমকালকে বলেন, সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের জন্য এসব হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের যথাযথ হাতেকলমে প্রশিক্ষণ না থাকলে ভবিষ্যতে ভালো চিকিৎসা পাওয়া কঠিন। তাই এসব হাসপাতাল যথাসময়ে নির্মাণ না হওয়ায় একদিকে মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও যথাযথ প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। উভয়ভাবেই ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, শুধু এ প্রকল্পেই নয়, প্রায় সব ধরনের প্রকল্প যথাযথ সময়ে বাস্তবায়ন না হলে ব্যয় বেড়ে যায়। এতে সরকারের ঋণ বাড়ে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত জনজীবনের ওপর পড়ে। তাই এসব প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়নে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। 

কেন এত দেরি 
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি শুরুর পর থেকেই অর্থায়ন নিয়ে জটিলতা ছিল। প্রথমে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া যায়নি। ফলে দীর্ঘ সময় মূল নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে এলওসি বাদ দিয়ে সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থায়নের পরিবর্তন ও বাজেট সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। পাশাপাশি দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় জটিলতা, একাধিকবার দরপত্র বাতিল এবং পুনরায় দরপত্র আহ্বানের কারণে ঠিকাদার নিয়োগেও দীর্ঘ সময় লেগেছে। 

প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ আমজাদুল হক সমকালকে বলেন, প্রকৃতপক্ষে ২০২৪ সালের জুনে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে প্রকল্পের বয়স অনেক বেশি হলেও বাস্তবে নির্মাণকাজ শুরুর সময়কাল বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অর্থায়ন জটিলতা অন্যতম। এ ছাড়া দরপত্র সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতার কারণে কাজ এগোতে সময় লেগেছে।

প্রকল্প পরিচালক জানান, সময় বাড়ার পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং নতুন কিছু কাজ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ব্যয় বাড়ছে। ২০১৮ সালে প্রকল্পে ২১টি বিভাগ রাখার পরিকল্পনা ছিল। এখন তা বেড়ে ৩১টি হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সুপারস্পেশালাইজড শাখা যুক্ত হয়েছে। ফলে হাসপাতালগুলোর পরিধি ও সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে।

ধীরগতির বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী সমকালকে বলেন, প্রকল্পটির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদ বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দরপত্র পাঁচবার বাতিল হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। অন্যগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। দরপত্র হয়, পরে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করতে হয়— এভাবেই কাজ এগোচ্ছে। তবে এর মধ্যে কিছুটা অগ্রগতিও হয়েছে।

তিনি বলেন, অন্য হাসপাতালগুলোর কাজও প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এখন থেকে কাজের গতি বাড়বে বলে আশা করা যায়। ব্যয় বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্মাণকাজের বিভিন্ন রেট পরিবর্তন এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) রেট শিডিউল পরিবর্তনের কারণে ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে।

সংশোধনী প্রস্তাবে যা আছে 
দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে চিকিৎসা যন্ত্রপাতির দাম বেড়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং সাড়ে ৭ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপ করা হচ্ছে, যা আগের তুলনায় বেশি।

এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় নতুন করে এস্কেলেটর, ফায়ার সিস্টেম, কনফারেন্স সিস্টেম, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশনসহ বিভিন্ন আধুনিক সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এসব কারণে প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে বলে সংশোধনী প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ৮৩৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং আসবাবের জন্য ২৩৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রশ্ন
দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পর্যালোচনা করে প্রকল্পের ধীরগতিতে অসন্তোষ জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সাত বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২৭ শতাংশ হওয়া হতাশাজনক। বাকি কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কীভাবে শেষ করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছে কমিশন।

এ ছাড়া চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও আসবাবের জন্য প্রস্তাব করা ব্যয়ও পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুপারিশ করেছে কমিশন। যন্ত্রপাতির জন্য ৮৩৪ কোটি ৯৩ লাখ এবং আসবাবের জন্য ২৩৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবকে তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে করছে কমিশন।

কমিশন আরও বলেছে, শুধু হাসপাতালের ভবন নির্মাণ করলেই হবে না; এগুলো চালু করার আগে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া ও সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি দেশের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রকল্পটির ভূমিকা ডিপিপিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য 
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা জেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। চারটি হাসপাতাল চালু হলে সেখানে প্রায় এক হাজার চিকিৎসকসহ বিপুলসংখ্যক নার্স ও অন্যান্য পেশাজীবীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

হাসপাতালগুলোতে উন্নত অপারেশন থিয়েটার, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ), এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ আধুনিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সুবিধা থাকার কথা রয়েছে।

 

আরও পড়ুন

×