ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিকার বিল

গণভোটের রায় এড়ানোর অভিযোগ, বিরোধী দলের ওয়াকআউট

গণভোটের রায় এড়ানোর অভিযোগ, বিরোধী দলের ওয়াকআউট
×

পরিপূর্ণ সংস্কারকে পাশ কাটানোর অভিযোগে সংসদ অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান বিরোধী দলের সদস্যরা - ভিডিও থেকে

 সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ১০:০২ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ তদন্তে আন্তঃবাহিনী তদন্ত দল গঠন এবং গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্যের বিধান রেখে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ জাতীয় সংসদে তোলা হয়েছে। এতে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি রাখা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। একই দিন সংসদে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন করতে আরেকটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। 
গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদের বৈঠকে বিল দুটি আলাদাভাবে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। পরে বিলগুলো দুই কার্যদিবসের মধ্যে পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। 

বিল দুটি উত্থাপনের আগেই বিরোধীদলীয় নেতা ফ্লোর নিয়ে বলেন, গণভোটের রায় পাশ কাটিয়ে বিলগুলো এমনভাবে আনা হচ্ছে, তাতে সংস্কারের মূল দাবিই চাপা দেওয়া হচ্ছে। এভাবে খণ্ডিত কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে চান না বলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছেন বলে জানান তিনি। এর আগে বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখার পাশাপাশি গুমের অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিলে বলা হয়, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গুম একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ বিল পাস হলে গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা হবে।
এতে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা এবং সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া গুমের মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ করেছিল। সেখানে গুমের অভিযোগ তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে। অবশ্য বর্তমান সরকার ওই অধ্যাদেশটি সংসদে অনুমোদন করেনি। এখন তারা নতুন বিল এনেছে।

বিলে বলা হয়েছে, কোনো বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বা স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকার ওই অভিযোগের তদন্তভার অভিযুক্ত বাহিনী ব্যতিরেকে অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে অর্পণ করবে।
বিলে বলা হয়েছে, এখতিয়ারসম্পন্ন দায়রা জজ আদালত গুমের অপরাধের বিচার করবে। অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। এ সময়ে সম্ভব না হলে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে পরের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।

বিলে আরও বলা হয়েছে, এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে দাখিল করা অভিযোগটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে বিচার্য, তাহলে তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণ চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পাঠাতে হবে। 

মানবাধিকার কমিশন আইন করতে বিল
২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে সংসদে নতুন বিল তুলেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে এই কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল। এখন যে আইন করা হচ্ছে, সেখানেও কিছু ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা বিদ্যমান আইনের চেয়ে বিস্তৃত করা হচ্ছে। তবে কমিশন গঠনের জন্য বাছাই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের যে ক্ষমতা প্রস্তাব করা হয়েছে, তা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কমিশন কতটা স্বাধীন থাকবে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন ও কমিশনারদের নিয়োগের লক্ষ্যে সুপারিশ দেওয়ার জন্য একটি বাছাই কমিটি করার কথা বলা হয়েছে। কমিটিতে থাকবেন স্পিকার (সভাপতি), আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দল ও বিরোধী দল মনোনীত দুজন সংসদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ইউজিসি মনোনীত একজন অধ্যাপক, রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন নাগরিক প্রতিনিধি, নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন প্রতিনিধি।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, বাছাই কমিটির সভাপতি হবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্যদের মধ্যে থাকবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য, বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্য, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন নাগরিক প্রতিনিধি, একজন সাংবাদিক প্রতিনিধি এবং একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। এখন যেভাবে বাছাই কমিটি প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে এখানে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা অধ্যাদেশে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয় কমিশনকে। সংসদে উত্থাপিত বিলে এটি রাখা হয়নি। বিলে শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে অনুসরণীয় পদ্ধতি শিরোনামে আলাদা একটি ধারা আছে। এ ধরনের ধারা ২০০৯ সালের আইনেও আছে। বিলে বলা হয়েছে, শৃঙ্খলা বাহিনী বা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন নিজ উদ্যোগে বা কোনো আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। এ প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হলে কমিশন আর কোনো উদ্যোগ নেবে না। আর সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে সুপারিশ পেশ করবে। এ রকম সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান তার গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে লিখিতভাবে কমিশনকে অভহিত করবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে এগুলো সংসদে উপস্থাপন করা হয়। এগুলো অনুমোদন বা অননুমোদনের শেষ সময় ছিল গত ১০ এপ্রিল। নির্ধারিত সময়ে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আনা হয়নি। ফলে এগুলো কার্যকারিতা হারায়। আর সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়।

গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ যে ১৬ অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ে বিল আকারে আনা হয়নি, সেগুলো আরও যাচাই-বাছাই করে নতুন বিল আনার কথা বলেছিল সরকার। এর একটি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ।

অন্যদিকে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনবিষয়ক তিনটি অধ্যাদেশ রহিত করে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনঃপ্রচলনে এই সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল পাস করা হয়েছিল। তখন অধিকতর যাচাই-বাছাই করে মানবাধিকার কমিশন আইন আরও শক্তিশালী করার কথা বলেছিল সরকার।

এর মধ্যে গত ৩ আগস্ট গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া অনুমোদন করা হয় গত ১০ আগস্ট। এ দুটি আইনের খসড়া অনুমোদন করার পর থেকে মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন পক্ষে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। খসড়ার কিছু বিষয় নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য
আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, এটা গতানুগতিক কোনো সংসদ নয়। সবার আশা ছিল, পরিবর্তনের একটা সূচনা হবে। সে লক্ষ্যেই সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু গণভোটের জন্য সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করা হয়নি। জনগণের রায়ে যখন বাস্তবায়িত হলো না; জনগণের মধ্যে একটা আতঙ্ক, একটা অনিশ্চয়তা, একটা সন্দেহ দেখা দিল। 

পাশাপাশি ১৩৩ অধ্যাদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ২০টির মতো তামাদি করা হলো। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, নির্বাচন কমিশন– এই মূল জায়গাগুলো, যেগুলো ঠিক না হলে ফ্যাসিবাদ থেকে এই দেশ ও সমাজ মুক্তি পাবে না, সেগুলোই তামাদি করে দেওয়া হলো। 

শফিকুর রহমান বলেন, সবকিছুতেই সংসদকে একতরফাভাবে, একপেশে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নীতিগতভাবে এ ধরনের বিলে অংশগ্রহণ করতে আমরা চাচ্ছি না। এর মাধ্যমে সংস্কারের মূল দাবিকেই চাপা দেওয়া হয়। 

তিনি বলেন, আমরা পুরো সংস্কার চাই, গণভোটের বাস্তবায়ন চাই এবং এভাবে খণ্ডিত কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাই না। এ জন্য এখন এ আলোচনায় আমরা অংশ নেব না। এই পর্বে সংসদ থেকে বিদায় নিচ্ছি। ওয়াকআউট করছি। আবার যখন উপযুক্ত সময় আসবে, তখন আমরা আসব, অংশগ্রহণ করব; জনগণের পক্ষে কথা বলব।

বিরোধী দলকে ওয়াকআউট থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিরোধী দলের উদ্দেশ্য ছিল আইন প্রণয়নে সহযোগিতা না করা। মানবাধিকার কমিশন আইনটি অন্তর্বর্তী সরকার তাড়াহুড়ো করে ভুলত্রুটি রেখে করেছে। আমরা দেশি-বিদেশি অংশীজনের সঙ্গে কথা বলে একটি আন্তর্জাতিক মানের আইন বিল আকারে এনেছি। গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইনটিও সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে বিল আকারে নিয়ে এসেছি। 

তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের কোনো রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল না; কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল না। অনেকটা মার্শাল অর্ডারের মতো আদেশ জারি করা হয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক সমঝোতাহীন দুরভিসন্ধিমূলক একটা প্রতারণা করা হয়েছে। সেটির নাম হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫। 

আরও পড়ুন

×