ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত কয়লা উত্তোলনের আগে স্থানীয়দের বন্দোবস্ত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:১৩ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:২২
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আগে স্থানীয়দের রোজগারের বন্দোবস্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়।
সাবিকুন্নাহার তার সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, সরকার সম্প্রতি জ্বালানি সংকট মোকাবিলার যুক্তিতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উৎপাদনের আলোচনা করছে। এই পদ্ধতিতে অধিক কয়লা উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও কৃষি জমি, বসতি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিশেষ করে জীব বৈচিত্র্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। ফুলবাড়ী প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের নামে যদি কৃষিজমি ধ্বংস হয়, হাজার হাজার মানুষ উচ্ছেদ হয় এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন জনগণের জন্য নয়। সরকারকে আগে পূর্ণ পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা প্রকাশ করতে হবে এবং স্থানীয় জনগণের সম্মতি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের মনোভাব জানতে চাই।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এই দেশ ও দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করি। সংসদ সদস্য যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন- অবশ্যই দেশের জ্বালানির সমস্যার সমাধান করতে চাইছি। আমাদের ফুলবাড়ীতে যে কয়লার খনি রয়েছে। যেটা পৃথিবীর ভালো কয়লাগুলোর মধ্যে একটি। কাজেই আমরা এই কয়লা উত্তোলন করে যদি জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে পারি তাতে বৈদেশিক মুদ্রা যেমন সাশ্রয় করবে এবং দেশের জন্য তা ভালো হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, এই কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলন করতে গেলে সেখানে যেসব বসতবাড়ি ও কৃষিজমি আছে, আগে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো কীভাবে সেই মানুষগুলোর বন্দোবস্ত করা যায়। বন্দোবস্তসহ তাদের যাতে আয় রোজগার বন্ধ হয়ে না যায় সে প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। সেই প্রকল্প থেকে তারা কোনো না কোনোভাবে সুবিধা পেতে পারে তা পর্যালোচনা করে এবং অবশ্যই পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো।
সংরক্ষিত আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত স্বৈরাচারের সময়ে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে রীতিমতো পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। তার ফলে অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান বা আমদানি নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার সমন্বিত কর্মপরিচালনা বাস্তবায়ন করছে।
ওই সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী গ্যাস সংকট মোকাবিলায় নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন/ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ খনন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ১৪০ এমএসসিএডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমান চলমান ৭টি কূপ খনন শেষ হলে আরো ৮৫ এমএসসিএডি গ্যাস যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপসমূহ খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।
সরকার প্রধান বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ৪৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪২০০ বর্গ কিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লি. (বাপেক্স)-কে শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে আরও দুটি করে নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অফশোর ও অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
সংরক্ষিত আসনের সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়াতে বর্তমান সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সৌরপ্যানেল স্থাপনের অপরিহার্য পণ্যের কর অব্যাহতি দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশীয় শিল্প ও সোলার প্যানেল শিল্প গড়ে তোলার জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সাথে লিথিয়াম ব্যাটারি যাতে এ দেশে উৎপাদিত হয় তার জন্য কর মওকুফ করা হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী ৬ মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন তাদের গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ দশমিক ১৫ টাকা করে কিনবে। বাল্ক রেটের অতিরিক্ত টাকা সরকার প্রণোদনা হিসেবে প্রদান করবে।
তিনি জানান, দেশের সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসমূহে গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ছাদে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। সোলার ছাড়াও পানি বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এই কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে।