দেশে বাতরোগে আক্রান্ত চারজনে একজন কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:২৯
দেশের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোনো না কোনো ধরনের বাতরোগে আক্রান্ত। তাদের প্রতি চারজনে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন এবং কাজের সক্ষমতা হারাচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে অনেক পরিবারই আর্থিক সংকটে পড়ছে।
আজ শনিবার রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে প্রফেসর নজরুল রিউমাটোলজি ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ (পিএনআরএফআর) ট্রাস্ট আয়োজিত ‘১০ম রোগী শিক্ষা কার্যক্রম ও ১ম বৈজ্ঞানিক সম্মেলন’–এ বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিএনআরএফআর ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান এবং শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নীরা ফেরদৌস।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জাতীয় পর্যায়ের মাসকুলোস্কেলিটাল গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ বাতরোগে আক্রান্ত। তাদের ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। আর ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ বছরের কোনো না কোনো সময়ে কাজের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এর আগে পরিচালিত আঞ্চলিক কোপকর্ড জরিপেও দেশের ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের হাড় ও পেশির ব্যথায় ভোগার তথ্য পাওয়া যায়।
ডা. নীরা ফেরদৌস বলেন, ‘বাতরোগের কারণে শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপেও পড়তে হচ্ছে। রোগের ধরন ও চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে বছরে চিকিৎসা ব্যয় কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।’
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় বছরে প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা এবং স্পন্ডাইলোআর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ৪০ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এ ছাড়া হাঁটু প্রতিস্থাপনে দেড় লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা এবং হিপ ফ্র্যাকচারের অস্ত্রোপচারে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য উদ্ধৃত করে সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব সৃষ্টি করতে পারে এমন বাতরোগ অসংক্রামক রোগসংক্রান্ত জাতীয় নীতিতে এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে রিউমাটোলজি বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ফলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় অনেক রোগী প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পিএনআরএফআর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও বাতব্যথা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে অনেক বাতের রোগী স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। এতে কর্মক্ষম মানুষের কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো বাতরোগও দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যথেচ্ছ ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।’
সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, যথাসময়ে টিকা নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। বাতরোগীদের চিকিৎসায় সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বড় পরিসরে বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
দিনব্যাপী রোগী শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের কাউন্সিলর ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মাহমুদ হোসেন প্রমুখ।