আলোচনা সভায় বক্তারা
লারমার সংবিধান দর্শন এখনো গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক
ছবি-সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:৪৯
বাংলাদেশের সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের একক আধিপত্য অন্যান্য জাতিসত্তার অস্তিত্ব ও অধিকারকে অস্বীকার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। তাঁদের মতে, বৈজ্ঞানিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনে বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন এখনো গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক। তাঁর চিন্তায় জুমচাষ, কৃষি, ভূমি, রাজস্ব, উৎপাদনব্যবস্থা, পরিবেশ-প্রতিবেশ, নারী এবং শোষিত-নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকারের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রহমান মিলনায়তনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘জাত্যভিমানী সংবিধানের খেরোখাতায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করে বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি ২০২৬।
উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব মনিরা ত্রিপুরার সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন লেখক, গবেষক ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও কলামিস্ট ড. মারুফ মল্লিক, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য শ্রী দীপায়ন খীসা, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী ড. ঈশিতা দস্তিদার এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের অর্থ সম্পাদক মেইনথিন প্রমীলা।
সভায় সভাপতিত্বের পাশাপাশি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক পাভেল পার্থ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে বাঙালি ছাড়া অন্যান্য জাতিসত্তার অস্তিত্ব অস্বীকারের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের বাঙালি কর্তৃত্ববাদী ও জাত্যভিমানী চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে। এর বিপরীতে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের ধারণা তুলে ধরে।
পাভেল পার্থ বলেন, লারমার সংবিধান দর্শনে জুমচাষ, কৃষি, ভূমি, রাজস্ব আদায়, উৎপাদনব্যবস্থায় কৃষির ভূমিকা, পরিবেশ-প্রতিবেশ, নারী এবং শোষিত-নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকারের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এসব চিন্তা একটি বৈজ্ঞানিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণে সহায়ক হতে পারে।
তিনি বলেন, পাকিস্তান শাসনামলে কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আগাম সতর্কতা দিয়েছিলেন। তাঁর বেড়ে ওঠা পরিবেশ ও সমাজের অভিজ্ঞতা থেকেই এ চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল। প্রকল্পটির ফলে বিশাল জনপদ, চাষযোগ্য জমি, শস্য ও প্রাকৃতিক প্রতিবেশব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।
আদিবাসী স্বীকৃতির প্রসঙ্গে পাভেল পার্থ বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আদিবাসীদের অস্তিত্ব ও ইতিহাসকে সাম্প্রতিক কোনো বয়ান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এ অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বহু প্রাচীন। তিনি জাতীয় সংসদ ভবন প্রতিষ্ঠার স্থান, কুর্মিটোলায় দেশের প্রথম বিমানবন্দর এবং ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত উচায় আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পাহাড়পুর আদিবাসী বিদ্যালয়ের উদাহরণ তুলে ধরেন। তাঁর মতে, আদিবাসী ও বাঙালির ঐতিহাসিক সম্প্রীতিকে অস্বীকার করে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র মতো পরিচয়ের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে।
গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী ড. ঈশিতা দস্তিদার বলেন, বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অধিকারসংক্রান্ত অতি ক্ষুদ্র বিষয়গুলোর সঙ্গেও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শনের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর দর্শন কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা নয়। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বিভিন্ন জনপদ সংকটে পড়ায় বর্তমানে লারমার পরিবেশ-প্রতিবেশ ভাবনার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শ্রী দীপায়ন খীসা বলেন, বিএনপি ও তারেক রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা এখনো স্পষ্ট নয়, বরং ধোঁয়াশাপূর্ণ। এর তুলনায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শন অধিক স্পষ্ট ও বৈজ্ঞানিক। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে, লারমা ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় গণপরিষদে সেই ধারণাই তুলে ধরেছিলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি ও ‘রেইনবো নেশন’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরিবর্তে দলটি ক্ষমতায় গিয়ে ভিন্ন অবস্থান নিতে পারে। তাঁর দাবি, সামরিক বাহিনী, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের সমন্বয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিপীড়ক কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমে বিএনপি সরকার অঞ্চলটিকে নতুন নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মেইনথিন প্রমীলা বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে যতভাবেই সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হোক, আদিবাসীরা তাঁদের আদিবাসী পরিচয় থেকে বিচ্যুত হবেন না। বিভিন্ন বয়ান ও পরিচয়ের আড়ালে আদিবাসীদের রাষ্ট্রীয় অধিকারকে চাপা দেওয়া হয়। সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের দখলদার চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে না। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্বার্থে হলেও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ফিরোজ আহমেদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নির্দিষ্ট কিছু সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক ব্যক্তির বাণিজ্যিক স্বার্থের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তার অজুহাতে সেখানে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকীকরণ ও সেটেলার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতেও প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান দর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা পালন করেছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। গণপরিষদের বিতর্ক থেকেই স্পষ্ট হয়, তিনি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।
ড. আমেনা মহসিন বলেন, পাহাড়িদের অস্থিরতা ও সংকটের যে ভিত্তি, তা ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময়ও ছিল। সে সময় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের অধিকার নিয়ে গণপরিষদে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অধিকার তুলে ধরে সংবিধানের ত্রুটিগুলো বিশ্লেষণ করেছিলেন।
ড. মারুফ মল্লিক বলেন, স্বাধীনতার পর প্রণীত সংবিধানে চাপিয়ে দেওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। এটি রাষ্ট্রে বহুত্ববাদী অন্তর্ভুক্তির পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যে দর্শন তুলে ধরেছিলেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যও প্রাসঙ্গিক।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পুরোনো ভুলগুলো সংশোধনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকার যদি জবাবদিহির ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে এবং ‘রেইনবো নেশন’ ধারণার মাধ্যমে সব জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, তাহলে নতুন আশার সৃষ্টি হতে পারে। অন্যথায় সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে না।
- বিষয় :
- আলোচনা সভা
- জন্মদিন
- সন্তু লারমা