ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

নজরুলের পরিবারে মাতম খবর শুনে মারা যান ফুফুও

নজরুলের পরিবারে মাতম খবর শুনে মারা যান ফুফুও
×
×

নজরুল ইসলাম

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির একজন নজরুল ইসলাম। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদরের বিরামপুরে। অভাব অনটনের পরিবার। সচ্ছলতার আশায় সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে ২০২২ সালে সৌদি আরব পাঠান বাবা আবদুল বাছির। সম্প্রতি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আসে। পরিবারে শুরু হয় মাতম। শোক সইতে না পেরে ফুফুও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

গতকাল সোমবার নজরুলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা শোকে মুষড়ে পড়েছেন। বাবা আবদুল বাছির ও মা রেহেনা বেগম কথা বলতে পারছেন না। দুজনই পাগলপ্রায়। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে নজরুল সবার বড় ছিলেন। 

পরিবার সূত্র জানায়, নজরুল ইসলাম এসএসসি পাস করে পরিবারের হাল ধরতে ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যান। পবিত্র মক্কা নগরীতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ পান। এর সাত মাস পর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ মিলছিল না। পরে হঠাৎ একদিন নজরুল মোবাইল ফোনে পরিবারকে জানান, তিনি কারাগারে। তবে কোনো কারণ জানাননি। গত ১১ অক্টোবর নজরুলের সঙ্গে পরিবারের শেষ কথা হয়। পরে গণমাধ্যমের খবরে জানতে পারেন, ১৪ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ খবর শুনে ওই রাতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। দুজনের মৃত্যুতে গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবদুল বাছির বলেন, ‘সংসারে সচ্ছলতার আশায় ছেলেকে সৌদি পাঠিয়েছিলাম। এখন ছেলেকেও হারালাম, বোনকেও হারালাম। আমি এখন নিঃস্ব, ঋণগ্রস্ত।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে এখন আমার দাবি, আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।’ 
জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, মরদেহ ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

মৃত্যুদণ্ডের রায়ের অনুলিপির অপেক্ষায় ঢাকা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ঢাকাকে কিছু জানানো হয়নি। এ ঘটনায় উদ্বেগের মধ্যেই রায়ের অনুলিপি ও বিস্তারিত তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি কেন হলো, তা জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যাও চেয়েছে সরকার।

এ ছাড়া বিদেশে কোনো বাংলাদেশির বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে তাকে কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আগেই বাংলাদেশকে অবহিত করবে বলে প্রত্যাশা করে সরকার। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলার সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এসব তথ্য জানান।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকে ‘খুবই হতাশাজনক’ উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এবং এখানে তথ্য আদান-প্রদান ও যোগাযোগে কেন ঘাটতি হয়েছে, তা জানতে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় অংশীদার সৌদি আরবের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছি। আমরা আলোচনা করছি।’
পুরো প্রক্রিয়ার কোনো এক পর্যায়ে ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অন্যদিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলার সময় শামা ওবায়েদ জানান, এ ঘটনার বিস্তারিত জানার জন্য তারা রায়ের অনুলিপি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রায়ের অনুলিপি পাওয়া পর্যন্ত দয়া করে অপেক্ষা করুন। এরপর আমরা সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব এবং কী করা যেতে পারে তা খতিয়ে দেখব।’
কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশে কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁর অনুরোধে আটককারী দেশকে সংশ্লিষ্ট দেশের কনস্যুলেটকে অবিলম্বে জানাতে হয় এবং কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ দিতে হয়। 
১৪ অক্টোবর সৌদি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, পবিত্র নগরী মক্কার একটি মসজিদ এলাকায় ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। 

‘পাপের লাশ’ বলা এমপির দুঃখ প্রকাশ
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে টেলিভিশন টকশোতে দেওয়া মন্তব্য প্রত্যাহার করে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজকল্যাণ সম্পাদক ও মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন। গতকাল নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট দিয়ে তিনি এ দুঃখ প্রকাশ করেন।

মন্ত্রীর ভুল তথ্য, পরে মন্ত্রণালয়ের সংশোধন
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির একজন অভিবাসী শ্রমিক, অন্যজন ওমরাহ যাত্রী ছিলেন বলে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী যে তথ্য দিয়েছেন, তা ভুল ছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশিই সেখানকার কর্মী ছিলেন বলে নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়। 
এক বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় জানায়, মন্ত্রী সৌদিতে হুতি হামলায় নিহত বাংলাদেশি সম্পর্কিত প্রশ্ন মনে করে উত্তর দিয়েছিলেন। বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রীর বরাতে বলা হয়েছে, বিমান যোগাযোগ এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া মাত্রই তাদের মরদেহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

দূতাবাসের ভূমিকা জানতে চান জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সরকার এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের কী ভূমিকা ছিল, তা জানতে চেয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জামায়াতে ইসলামীর আমির লিখেছেন, সরকার এবং বাংলাদেশ দূতাবাস এ ব্যাপারে অবস্থান স্পষ্ট করতে বাধ্য।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সমকাল ও নিজস্ব প্রতিবেদক এবং প্রতিনিধি)

আরও পড়ুন

×