ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

প্রজাপতি

সুন্দরবনের সিঁদুরী পদ্মরাগ

সুন্দরবনের সিঁদুরী পদ্মরাগ
×
×

সুন্দরবনের কটকা টাওয়ারের পাশের একটি বুনো ফুলে সিঁদুরী পদ্মরাগ প্রজাপতি লেখক

আ ন ম আমিনুর রহমান

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৩৩ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিরল কিছু পাখি-প্রাণীর সন্ধানে ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সুন্দরবন রওনা হলাম। পরের দিন নলিয়ান বা খুলনা রেঞ্জের আদাচাই বিটের শেখেরটেক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রে গেলাম। এলাকাটি বাঘের জন্য বিখ্যাত। সেদিন রাতে বড় গেছো প্যাঁচা (Brown Wood Owl) নামে একটি বিরল পাখির ছবি তুললাম। পরদিন সকালে সুন্দরী শিসমার (Mangrove Whistler) নামে আরেকটি বিরল পাখি দেখে আন্ধারমানিক হয়ে কটকার উদ্দেশে রওনা হলাম। 

২৮ সেপ্টেম্বর ভোরে কটকার জামতলী খাল ও বিভিন্ন খাঁড়িতে ঘণ্টা দুয়েক ঘুরে বেশ কিছু পাখি-প্রাণীর ছবি তুললাম। এর পর সকাল সাড়ে ৭টা নাগাদ বাঘের বাড়িখ্যাত কটকার টাওয়ারের সামনে এলাম। বনে প্রচুর হরিণ। ওদের ছবি তুলে জামতলী সৈকতের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু সৈকতে আর গেলাম না। আশপাশটায় আধঘণ্টার মতো ঘুরে সোয়া ৮টা নাগাদ টাওয়ারের কাছে ফিরে এলাম। 
টাওয়ারের পাশের বরই ও অন্যান্য বুনো গাছের ফুলে রঙিন ডানার প্রচুর পতঙ্গকে ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। এর মধ্যেই হলুদ রঙের একটি বুনো ফুলের ওপর সিঁদুরে লাল ও কালো রঙের সুন্দর এক পতঙ্গ এসে বসল। পতঙ্গটি মাঝে মাঝে উড়ছে, আবার এসে বসছে ওই হলুদ ফুলের ওপর। এর আগে পতঙ্গটিকে আরও কয়েকবার দেখেছি এই কটকাতেই। প্রথমবার দেখেছিলাম ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে। যাই হোক, সময় নষ্ট না করে পটাপট কটা ছবি তুলে নিলাম। 

সেই ভোর সাড়ে ৫টায় বেরিয়েছি। প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে। তাই দ্রুত পন্টুনে ফিরে ট্রলারের উঠে ছোট্ট লঞ্চ সিগালের দিকে রওনা হলাম। এ বছরের ১৬ অক্টোবর পতঙ্গটিকে আবার দেখলাম কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের লেম্বুর বনে। 

কুয়াকাটার দোলনা পয়েন্ট বরাবর লেম্বুর বনে ডানা মেলা অবস্থায় সিঁদুরী পদ্মরাগ প্রজাপতি

সুন্দরবন ও কুয়াকাটায় দেখা সিঁদুরে লাল ও কালো রঙের এই পতঙ্গটি এ দেশের বিরল ও বিপন্ন এক প্রজাপতি সিঁদুরী পদ্মরাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. বাশার  নামটি দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে এটি আলসিন্দুরা নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম Crimson Rose. প্যাপিলিওনিডি গোত্রের প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Pachliopta hector (প্যাচলিওপটা হেক্টর)। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও অস্ট্রেলিয়ায় দেখা যায়।  

সিঁদুরী পদ্মরাগ বড় আকারের প্রজাপতি। প্রসারিত অবস্থায় বাঁ পাশের ডানার এক প্রান্ত থেকে ডানপাশের ডানার বিপরীত প্রান্ত পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৯০-১১০ মিলিমিটার। দেহ উজ্জ্বল লাল। সামনের ডানার মাঝামাঝি ও শীর্ষদেশের কাছে স্পষ্ট সাদা পট্টি রয়েছে। পেছনের চকচকে নীলচে-কালো ডানায় উজ্জ্বল লাল ফোঁটা ও লম্বা লেজ থাকে। ডানার উভয় পাশের দাগ-ছোপ একই রকম। চোখ, শুঁড় ও পা কালো। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম, তবে স্ত্রীর দেহ কিছুটা ফ্যাকাশে ও পেছনের ডানার লাল অর্ধচন্দ্রাকৃতির ছোপ ও ফোঁটাগুলো আকারে বড়।

সিঁদুরী পদ্মরাগ খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে দেখা যায়। তবে, আমি এদের এ পর্যন্ত সুন্দরবন ও কুয়াকাটা ছাড়া আর কোথাও দেখিনি। এরা বনাঞ্চল ও উন্মুক্ত এলাকায় বাস করে। ফুলের মধু অত্যন্ত পছন্দ করে। সারাবছরই উড়তে দেখা যায়। সচরাচর ডানা ঝাপটায় ও সোজাসুজি ওড়ে। এদের মধ্যে পরিযায়নের স্বভাব প্রকট।
স্ত্রী প্রজাপতি গন্ধম, ঈশ্বরমূল, পাইপ ভাইন প্রভৃতি পোশক গাছের পাতার ওপর পাতাপ্রতি একটি  লালচে রঙের ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ৬-১০ দিনে। শূককীটের রং কালচে-বাদামি। পাঁচবার খোলস পাল্টে তিন-চার সপ্তাহে শূককীট বেগুনি-ছোঁয়া বাদামি রঙের মূককীটে পরিণত হয়। মূককীটের শক্ত খোলস কেটে ১০-২০ দিনে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি বেরিয়ে আসে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক প্রজাপতি মাত্র ৬-১৪ দিন বাঁচতে পারে। পুরো জীবন চক্র, অর্থাৎ ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি হতে ৩৯-৪৭ দিন সময় লাগে।     
ড. আ ন ম আমিনুর রহমান
পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
 

আরও পড়ুন

×