ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

সমকাল-আইন ও সালিশ কেন্দ্র অনলাইন গোলটেবিল

শিশুর নিরাপদ অনলাইন ব্যবহারে সচেতনতা চাই

শিশুর নিরাপদ অনলাইন ব্যবহারে সচেতনতা চাই
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২০ | ১৫:৫৭

শিশুদের জন্য নিরাপদ অনলাইনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সচেতনতার বিকল্প নেই। গ্রাহক পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা ছাড়া শুধু সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও আইন দিয়ে অনলাইনে শিশুদের যৌন হয়রানি বন্ধ করা সম্ভব নয়। গতকাল শনিবার সমকাল এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র আয়োজিত অনলাইন গোলটেবিলে এ মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে 'অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে করণীয়' শীর্ষক এ গোলটেবিলে অংশ নেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মুহিবুজ্জামান, টিডিএইচ নেদারল্যান্ডসের কান্ট্রি ডিরেক্টর মাহমুদুল কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপন, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও ফাইবার অ্যাট হোমের চিফ টেকনোলজি অফিসার সুমন আহমেদ সাবির, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল ইসলাম হাকিম, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক জাকির হোসেন খান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) গবেষণা কর্মকর্তা সাহানা আহমেদ, এ টু আইর শিক্ষাপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইমুম রেজা এবং ব্লাস্টের আইনজীবী রেজাউল করিম সিদ্দিকী। আলোচনায় দেশে অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন বিষয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের শিশু অধিকার ইউনিটের সমন্বয়ক অম্বিকা রয় এবং সঞ্চালনা করেন সমকালের ইভেন্ট ও বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ইমরান কাদির।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী মোট ৩৬৩ শিশু অনলাইনে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০১১ সালে ৩৫, ২০১২ সালে ৫১, ২০১৩ সালে ৭, ২০১৪ সালে ৯৮, ২০১৫ সালে ১২, ২০১৬ সালে ২৪, ২০১৭ সালে ১৩, ২০১৮ সালে ৪১, ২০১৯ সালে ৪৭ এবং চলতি বছরে ৩৪ জন নির্যাতনের শিকার হয়। গবেষণায় দেখা যায়, অনলাইনে যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৯ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব শিশুর ওপর চালানো জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ শিশু অনলাইনে নির্যাতনের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের দায়ী করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই শিশুদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সীরাও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন। এ ছাড়া পর্নোগ্রাফি ব্যবসায় সম্পৃক্ত সিন্ডিকেট শিশুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এদের বিস্তৃতি রয়েছে। গবেষণায় আরও বলা হয়, শিশুরা বেশি যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরিচিতদের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং নিজেদের নানা ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি শেয়ার করছে তারা। এমনকি কেউ কেউ তার বাবার ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের নম্বরও অপরিচিত বন্ধুকে দিয়েছে। পরে এই বন্ধুরাই তাদের ছবি ও তথ্য দিয়ে জিম্মি করে হয়রানি ও নির্যাতন করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুরা মনে করে এ ধরনের ঝুঁকি থেকে তারা নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম নয়। একটা অংশ মনে করে, তারা এসব নির্যাতনের ঘটনা পরিবারের বড়দের, বিশ্বস্ত বন্ধুদের জানাবে এবং পরিস্থিতি খুব বেশি প্রতিকূল হলে আইনগত সহায়তাও নেবে। তবে জরিপে দেখা যায়, ৮০ শতাংশের বেশি ভিকটিম সাইবার নির্যাতনের শিকার হওয়ার ব্যাপারে কোনো রিপোর্ট করে না, ৬৩ শতাংশ জানেই না কীভাবে রিপোর্ট করতে হয় এবং ৭৩ দশমিক ১ শতাংশ আইনগত পদক্ষেপ নিয়ে সন্তষ্ট নয়। শিশুদের অনলাইনে নির্যাতনের বিষয়ে ২০১৯ সালে সাইবার ট্রাইবুনালে ৭২১টি মামলা দায়ের হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে অম্বিকা রায় বলেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র শিশুদের নিরাপদ অনলাইন ব্যবহারে সচেতন করার মাধ্যমে যৌন নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন করার কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া 'নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা' শিরোনামে একটি নির্দেশিকা তৈরি করে তার প্রায় দুই হাজার ৫০০ কপি বিতরণ করা হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে যুগ্ম সচিব মুহিবুজ্জামান বলেন, শুধুমাত্র কিছু ওয়েবসাইট বন্ধ করে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না। গ্রাহক পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষতিকর সাইট এবং অপরিচিত বন্ধুদের সঙ্গে তথ্য ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করতে হবে। তিনি জানান, বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের হটলাইন ১০৯-এর সঙ্গে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং ৩৩৩ সংযুক্ত রয়েছে। ফলে ২৪ ঘণ্টাই ১০৯ নম্বরে ফোন করে সক্রিয় সহায়তা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের স্মার্টফোনে 'জয় অ্যাপ' ব্যবহার করেও যে কোনো স্থান থেকে জরুরি সেবা পাওয়া সম্ভব। কোনো বিপজ্জনক অবস্থা মনে হলে এই অ্যাপ চালু করার সঙ্গে অ্যাপটি চারপাশের ছবি ও কথাবার্তা রেকর্ড করে লোকেশনসহ পুলিশের তিনটি এফএনএফ নম্বরে পাঠিয়ে দেবে এবং দ্রুত সহায়তা পাওয়া যাবে।

টিডিএইচ নেদারল্যান্ডসের কান্ট্রি ডিরেক্টর মাহমুদুল কবির বলেন, অনলাইনে শিশুদের যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অশিক্ষিত মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে এবং তারা এর ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন নয়। আবার যারা শিক্ষিত তাদেরও অনেকেই যেমন সচেতন নন, তেমনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে শিশুদের টার্গেট করছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সচেতনতা সৃস্টি এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি সংগঠনগুলো কাজ করছে। যারা ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে তারাও কাজ করছে। তিনি আশা করেন, সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ সমস্যা থেকে সফল উত্তরণ সম্ভব হবে।

ঢাবির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপন বলেন, শিশুদের সঙ্গে আচরণের বিষয়ে খুব সচেতন থাকতে হবে। না হলে শিশুরা অপরাধ থেকে দূরে সরে যাওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি সহিংস হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি বয়সেও বিছানায় জল বিয়োগ করার কারণে বাবা-মা বকাঝকা করায় শিশু সহিংস হয়ে খুন পর্যন্ত করে ফেলেছে। এ কারণে শিশুদের আন্তরিকতা এবং হূত্যতাপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনের সংস্কার করে আইনে অপরাধের বিষয়গুলো আরও সুনির্দিষ্ট করতে হবে, তাহলে আইন থেকে আরও বেশি সুফল পাওয়া যাবে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, শিশুদের অনলাইনে নিরাপদ রাখতে অভিভাবকদের সবার আগে সচেতন হতে হবে। তিনি নিজের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তার সন্তানের ইউটিউব অ্যাকাউন্ট আছে এবং তিনি সন্তানের জি-মেইল অ্যাকাউন্ট দিয়ে সেটি লগইন করার ব্যবস্থা করেছেন। ফলে খুব সহজেই তিনি সন্তান কি ধরনের কনটেন্ট দেখছে তা পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। এ ছাড়া শিশু সন্তানকে তিনি ইন্টারনেটে শিক্ষামূলক, সুস্থ বিনোদনের জন্য আকর্ষণীয় সাইটগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ফলে তার শিশু এ ধরনের কনটেন্টই দেখছে। তিনি বলেন, যেহেতু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর ব্যবহারের ইতিহাস থেকে পছন্দ বিচার করে কনটেন্ট প্রদর্শন করে, সে জন্য শিশুদের ভালো সাইট ব্রাউজ করা পিতা-মাতাকেই নিশ্চিন্ত করতে হবে। তিনি বলেন, সাইট বন্ধ করে, কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ করে ইন্টারনেট নিরাপদ করা যাবে না।

আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল ইসলাম হাকিম বলেন, আইএসপিএবির পক্ষ থেকে গত তিন বছরে ঢাকার বাইরে প্রায় সাত থেকে আট লাখ মানুষকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতন করার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এ ছাড়া এখন গ্রাহকরা ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে 'প্যাটারনাল কন্ট্রোল' সেবা দিতে বাধ্য। গ্রাহকরা সচেতন হলে আইএসপির কাছ থেকে এ সেবা নিতে পারেন এবং ফলে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, ব্যাপক মাত্রায় সচেতনতা ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

বিটিআরসির জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক জাকির হোসেন খান বলেন, বিটিআরসি আইএসপি এবং মোবাইল অপারেটরদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতন করার নির্দেশনা দিয়েছে। এ ছাড়া ইন্টারনেট সেবায় 'প্যাটারনাল কন্ট্রোল' সেবা বাধ্যতামূলক করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিটিআরসি সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সাইট বন্ধ করে, ঢালাওভাবে কিছু বন্ধ করে না। বিটিআরসি তার কার্যক্রমে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ইন্টারনেটে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।

এনসিটিবির গবেষণা কর্মকর্তা সাহানা আহমেদ বলেন, পাঠক্রমে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কিত রচনা সংযুক্ত করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নিয়েছে এনসিটিবি। এরই মধ্যে কয়েকটি স্তরে তা চালু হয়েছে এবং ২০২২ সালের মধ্যে নতুন কারিকুলামে এ সংক্রান্ত রচনা সব স্তরেই থাকবে। তিনি জানান, এ ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরেরও বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে।

এটুআইর শিক্ষাপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম বলেন, শিশুদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও শিক্ষামূলক আরও বেশি কনটেন্ট অনলাইনে দিতে হবে। শিশুদের এসব কনটেন্টের প্রতি আগ্রহী করতে হবে। শিশুরা যদি ভালো কনটেন্টে অভ্যস্ত হয় তাহলে ক্ষতিকর প্রবণতায় আসক্ত হবে না। এ দিক বিবেচনায় রেখে এটুআই অনলাইনে শিশুদের উপযোগী কনটেন্ট তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইমুম রেজা বলেন, শিশুদের মধ্যে যারা টিনএজার তারাই সমস্যায় পড়ছে বেশি। কারণ তাদের বয়সটা কৌতূহলের এবং কৌতূহলের বশবর্তী হয়েই তারা অপরিচিতদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, ক্ষতিকর সাইটে ভিজিট করছে। আবার এই বয়সীরাই নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিক সংকটে পড়ছে। ফলে তাদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম ব্যাপক হারে চালাতে হবে।

ব্লাস্টের আইনজীবী রেজাউল করিম সিদ্দিকী বলেন, বিদ্যমান কয়েকটি আইনেই অনলাইনে শিশুদের নির্যাতন থেকে প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু আইন থেকে প্রতিকার কীভাবে পাওয়া সম্ভব সেটাই বেশিরভাগ মানুষ জানে না। আবার আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা আছে। এ কারণে নতুন আইন নয়, বরং বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই অনলাইনে যৌন নির্যাতন থেকে শিশুদের রক্ষা করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

×