সগিরা মোর্শেদ হত্যা
ত্রিশ বছর পর এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাব
সাহাদাত হোসেন পরশ ও বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:০৪ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:১৯
'টেলিভিশনে দেখলাম সগিরা মোর্শেদ হত্যার আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এলাকার চায়ের দোকানে এই খবর দেখে চমকে গেলাম। গ্রামের সবাই মনোযোগ দিয়ে দেখল। সবাই জানত, সগিরা হত্যার ঘটনায় আমাকে ফাঁসিয়েছে পুলিশ। ওই মামলায় সাড়ে তিন বছর জেলও খেটেছি। এরপর হত্যার দায় নিয়ে ত্রিশ বছর ধরে ঘুরছি। হঠাৎ বৃহস্পতিবার সগিরা হত্যার ঘটনায় জড়িতদের খবর জানতে পেরে বুকে চাপা পাথর যেন সরে গেল। এখন যেন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারব।'
গতকাল শুক্রবার সমকালের সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের পাউসার গ্রামের কৃষক মন্টু মণ্ডল (৬২)। এলাকায় মন্টুর একটি কৃষিনির্ভর ছোটখাটো প্রজেক্ট রয়েছে।
১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক সগিরা মোর্শেদ খুন হন। এ ঘটনায় রাজধানীর খিলগাঁও এলাকা থেকে একই বছর গ্রেপ্তার করা হয় মন্টু মণ্ডলকে। তিনি তখন ৩২ বছরের যুবক। পরে পুলিশের সাজানো চার্জশিটে তাকে ছিনতাইকারী হিসেবে আসামি করা হয়। ওই মামলায় সাড়ে তিন বছর কারাগারে থাকার পর জামিনে বের হন তিনি। তবে সগিরা হত্যাকাণ্ডের আসামি করে যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল, তাতে পাল্টে যায় মন্টুর জীবনের গল্প।
মন্টু মণ্ডল সমকালকে জানান, ত্রিশ বছর আগে তাদের সংসারে তেমন সচ্ছলতা ছিল না। সংসারের অভাব-অনটন দূর করতে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন তিনি। এ জন্য পাসপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে পাসপোর্টের অফিস ছিল মগবাজারে। পাসপোর্ট পেতে এক দালালের দ্বারস্থ হন তিনি। দালালের বাসা ছিল খিলগাঁও। মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে দালালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে খিলগাঁও যান তিনি। তখন সন্ধ্যা নামবে। ওই সময় রাস্তায় হট্টগোল শুরু হয়। এ সময় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তখন মন্টু মণ্ডলকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
৭-৮ দিন ডিবি পুলিশ ও থানায় রাখা হয় মন্টুকে। এরপর সগিরা হত্যা মামলায় তাকে একমাত্র আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হয়। পরে ৭-৮ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন সবাই বলছিলেন, চার্জশিটে যাকে আসামি করা হয়েছে, তাকে কেউ চেনেন না। এর পরও সাড়ে তিন বছর জেলে ছিলেন তিনি। পরে তার বোন জামাই এলাকার এক আইনজীবীকে নিয়োগ করেন। তার মাধ্যমে জামিনে মুক্তি পান তিনি। ফরিদপুর কারাগার থেকে ছাড়া পান মন্টু।
মন্টু মণ্ডল বলেন, 'কোনো অন্যায় করিনি। তবু হত্যা মামলার দায় নিয়ে জেল খেটেছি। একই দায় নিয়ে ত্রিশ বছর বেঁচে আছি। ওই এক ঘটনা জীবন শেষ করে দিয়েছে। যদি পাসপোর্ট করে বিদেশে যেতে পারতাম, আজ কোথায় থাকতাম! জীবনের বাঁক ঘুরিয়ে দেওয়া এই ভুলের দায় কে নেবে! ঘুমের মধ্যে মাঝে মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখতাম। সম্প্রতি হঠাৎ হাইকোর্ট থেকে গ্রামের ঠিকানায় চিঠি আসে। সেখানে আমি জীবিত নাকি মৃত, তা জানতে চাওয়া হয়। এরপর আবার পুলিশ থেকে আমার ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হয়। তখনও পরিস্কারভাবে জানতাম না, কী হতে চলেছে। সবশেষে বৃহস্পতিবার যখন টেলিভিশনে সগিরা হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের খবর দেখলাম, তখন চোখ দিয়ে মনের অজান্তে পানি পড়ছিল।'
মন্টু মণ্ডল আরও বলেন, নতুনভাবে সগিরা হত্যার তদন্তের কথা জানতে পেরে দ্রুত আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি পরামর্শ দেন, এ ঘটনায় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের কাটিং সংগ্রহ করতে। বিভিন্ন পত্রিকা সংগ্রহ করতে মুন্সীগঞ্জ থেকে তাই গত ৮ নভেম্বর শুক্রবার ঢাকায় যাই।
সগিরা হত্যার রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন প্রত্যক্ষদর্শী এক রিকশাচালক। তার নাম আব্দুস সালাম। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি সমকালকে বলেন, সগিরা তার রিকশার যাত্রী ছিলেন। তার সামনেই রিকশায় বসে থাকা সগিরাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এখনও আব্দুস সালাম ভুলতে পারেননি সেই নৃশংস হত্যার ঘটনা। তিনি বলেন, রাজারবাগ এলাকা থেকে তিনি সগিরাকে চার টাকা ভাড়া চুক্তিতে রিকশায় করে নিয়ে যাচ্ছিলেন সিদ্ধেশ্বরীর ভিকারুননিসা স্কুলের সামনে। কালীমন্দির গলির সামনে আসামাত্র একটি মোটরসাইকেলে দু'জন তার পিছু নেয়। ভিকারুননিসা স্কুলের কাছাকাছি এলে ওই মোটরসাইকেলটি রিকশার সামনে এসে রিকশা থামিয়ে দেয়। তারা সালামকে চুপচাপ রিকশায় বসে থাকতে বলে, না হলে গুলি করবে বলে জানায়। এর পরই সগিরার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় একজন। সগিরা লম্বা আকৃতির লোকটাকে চিনে ফেলেন। সগিরা বলেন, 'আমি তোমাকে চিনি।' তার নামও উল্লেখ করেন সগিরা। এক পর্যায়ে খাটো লোকটা কোমর থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে সগিরাকে গুলি করে। রিকশার বাঁ দিকে ঢলে পড়েন তিনি। এরপর ফাঁকা গুলি করে তারা পালিয়ে যায়। সালাম ইট হাতে নিয়ে 'হাইজ্যাকার' বলে চিৎকার করতে করতে বেইলি রোডে মহিলা সমিতি পর্যন্ত দৌড়ে যান। সালাম বলেন, সেদিন অনেক লোক ছিল রাস্তায়। কিন্তু তার চিৎকারে কেউ এগিয়ে আসেনি। যদি মানুষ ছুটে আসত, তাহলে হয়তো সগিরা রক্ষা পেতেন তাদের হাত থেকে।
রিকশায় সগিরাকে রক্তাক্ত অবস্থায় রেখে সালাম ছুটে যান রমনা থানায়। ঘটনা জানান পুলিশকে। সালামকে নিয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসার আগেই রুমি নামে একজন চিকিৎসক সগিরাকে রিকশা থেকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন সগিরাকে। পরে পুলিশ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে থেকে লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়।
হত্যার আড়াই মাস আগেও ঝগড়া ও পারিবারিক বৈঠক :হত্যাকাণ্ডের আড়াই মাস আগে সগিরার মেজো ভাশুর ডা. হাসান আলী চৌধুরীর সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছিল। সগিরার স্বামী আব্দুস ছালাম চৌধুরী সমকালকে জানান, একই বাড়ির তিনতলায় পরিবার নিয়ে থাকতেন তার মেজো ভাই ডা. হাসান। দোতলায় থাকতেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের আড়াই মাস আগে তাদের বাসার গৃহকর্মী সিঁড়িতে থুথু ফেলেছিল। এ কারণে ডা. হাসান গৃহকর্মীকে চড়থাপ্পড় মারেন। সগিরা এর প্রতিবাদ করেছিলেন। ডা. হাসানের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কেন তার গৃহকর্মীকে মারধর করা হচ্ছে। এ নিয়ে তিনতলায় ডা. হাসানের বাসায় দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বৈঠক হয়। সে সময় হাসানের স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা ওরফে শাহিন হুমকি দিয়েছিলেন সগিরাকে। বলেছিলেন, তাকে দেখে নেবেন তিনি। আব্দুস ছালাম চৌধুরী বলেন, দেখে নেওয়ার অর্থ যে সগিরাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া, এটা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। এ কারণে এতদিন ভাই-ভাবিকে সন্দেহের তালিকায়ও রাখেননি।
পিবিআই সূত্র জানিয়েছে, ১৯৯০ সালে তদন্ত করে আদালতে এই মামলার চার্জশিট দাখিল করেন ডিবির সেই সময়ের পরিদর্শক আব্দুল জলিল। ছিনতাইয়ের ঘটনা সাজিয়ে মন্টু মণ্ডলকে অভিযুক্ত করে চার্র্জশিট দেওয়া হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রিকশাচালক আব্দুস সালামের সাক্ষ্য নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করেননি। গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে সগিরা একজনকে চিনতে পারার কথা বলেছিলেন। তার নামও উচ্চারণ করেছিলেন। রিকশাচালক তার প্রত্যক্ষদর্শী। তাকে সাক্ষী কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করলেই ঘটনার আসল রহস্য বের করে আনা সম্ভব ছিল। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা রিকশাচালকের খোঁজ কিংবা ঘটনার বর্ণনা না শুনে মনগড়া ছিনতাইয়ের ঘটনা সাজিয়ে অন্যকে ফাঁসিয়ে দিয়েছিলেন। এখন জজ মিয়া নাটক সাজানো সেই পুলিশের বিচার দাবি করছেন ভুক্তভোগীরা। তারা বলছেন, এই মামলা তৎকালীন ডিবির কলঙ্ক, আর বর্তমান পিবিআইর সাফল্য।
১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই সিদ্ধেশ্বরীতে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে খুন হন সগিরা। ওই ঘটনায় মন্টু মণ্ডলকে আসামি করে চার্জশিট দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এক নারীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই মামলায় ১৯৯১ সালে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ১১ জুলাই মামলার স্থগিতাদেশ তুলে নিয়ে পুনঃতদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন আদালত। এরপর ত্রিশ বছর আগের ঢাকার একটি চাঞ্চল্যকর খুনের মামলার প্রকৃত রহস্য উদ্করে পিবিআই। গ্রেপ্তার হয়েছে চারজন প্রকৃত আসামি। যারা ইতোমধ্যে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে সগিরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন- বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসক হাসান আলী চৌধুরী, তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিন, হাসানের শ্যালক আনাস মাহমুদ রেজওয়ান ও মূল শুটার মারুফ রেজা। যে নারীর আবেদনের পর মামলাটি তদন্তের ব্যাপারে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয় তিনি ছিলেন মারুফ রেজার মা।
এ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী নিহতের স্বামী আব্দুস ছালামের মেজো ভাই বারডেমের চিকিৎসক হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা ওরফে শাহিন। সগিরার উচ্চতর ডিগ্রি, চাকরি এবং শাশুড়ির অতি স্নেহ মেনে নিতে পারেননি মাহমুদা। পারিবারিক প্রতিহিংসার শিকার হন সগিরা। ঘরোয়া নানা বিষয়-আশয় নিয়ে সগিরা-মাহমুদার মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত। তাই সগিরাকে শায়েস্তা করতে স্বামী চিকিৎসক হাসান আলী চৌধুরীর সঙ্গে শলাপরামর্শ করেন মাহমুদা। সগিরাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তারা। ২৫ হাজার টাকায় খুনি মারুফ রেজাকে ভাড়া করা হয়। মারুফ রেজা ছিলেন ডা. হাসান আলীর পেশেন্ট।
- বিষয় :
- সগিরা মোর্শেদ হত্যা
- হত্যা
- রাজধানী
