অনিয়মেই সড়কে ঝরছে প্রাণ
রাজীব আহাম্মদ
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:৪৫
গত শুক্রবার সড়কে প্রাণ গেছে অন্তত ২৬ জনের। বেসরকারি সংস্থা যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে নভেম্বরে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৪৮৬ জনের। দিনে গড়ে ১৬ জনের বেশি মানুষের প্রাণ যাচ্ছে সড়কে। দুর্ঘটনার কারণ বিশ্নেষণে দেখা যাচ্ছে, এসব মৃত্যুর কারণ ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, গাড়ি ও অব্যবস্থাপনা।
পরিবহন খাত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, রাস্তা চওড়া ও উন্নত হলেও নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত। যানবাহনও নিরাপদ নয়। কিন্তু যেনতেনভাবে ফিটনেস পেয়ে যাচ্ছে। সরকার নিষিদ্ধ করলেও মহাসড়কে দাপিয়ে চলছে অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত হালকা যানবাহন। উচ্চ আদালত উচ্ছেদ করতে বললেও চলছে অবৈধ নছিমন-করিমন, যাতে নূ্যনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ভারী যানবাহনের সঙ্গে এসব হালকা গাড়ির সামান্য সংঘর্ষেও প্রাণ যাচ্ছে সড়কে।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে জেল-জরিমানা বহুগুণ বাড়িয়ে 'সড়ক পরিবহন আইন' পাস হলেও মৃত্যু ও দুর্ঘটনার সংখ্যার উনিশ-বিশ হয়নি। বহুল আলোচিত আইনটিও সড়কে পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও সম্প্রতি একাধিকবার বলেছেন, অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও সড়কে শৃঙ্খলা আসেনি।
প্রতিবছর শীতে দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। এবারও একই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। শুক্রবার মানিকগঞ্জের দৌলতপুরের মুলাকান্দিতে বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকসহ ছয়জনের প্রাণ গেছে। দুর্ঘটনাস্থলে রাস্তায় বাঁক ছিল। কিন্তু স্থানীয়দের বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, রাস্তায় বাঁক এত বেশি নয় যে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি দেখা যাবে না। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিহত অটোরিকশাচালক জামাল শেখের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না।
জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশাসহ ধীরগতির যান চলাচল নিষিদ্ধ। দৌলতপুরের দুর্ঘটনাস্থলটি আঞ্চলিক মহাসড়কে পড়েছে। তাই অটোরিকশা চলাচলে অনুমতি রয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ সমকালকে বলেছেন, অনুমতি থাকলেও বড় গলদ ছিল। অটোরিকশায় চালকের পাশে যাত্রী তোলা নিষিদ্ধ। কিন্তু দুর্ঘটনা বিশ্নেষণে দেখা গেছে, অটোরিকশার পেছনে তিনজন এবং সামনে চালকসহ তিনজন ছিলেন। এ কারণে হয়তো চালক ভারসাম্য রাখতে পারেননি। তবে বিস্তারিত তদন্ত ছাড়া প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব নয়।
পরিবহন খাত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, গলদ ছিল বলেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। সড়কে অল্প বাঁক থাকলেও সেখানে বিভাজক ছিল না। তাই ভ্যালুসিটির (দ্রুতি) কারণে বাঁক ঘোরার সময় অটোরিকশা বাসের সামনে চলে আসে। দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম সমকালকে বলেছেন, ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে আসবে কেন দুর্ঘটনা ঘটেছিল।
শুক্রবার সকালে জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা মহাসড়কের মির্জাপুরের কুর্নিতে রাস্তায় থেমে থাকা বাসে ট্রাকের ধাক্কায় ছয়জনের মৃত্যু হয়। গোড়াই হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন সমকালকে বলেছেন, তার ধারণা, ট্রাকচালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এ কারণেই রাস্তায় দাঁড়ানো বিকল বাসকে দেখতে পাননি। বাসেও গাফিলতি ছিল। চালক চাইলে রাস্তার পাশে নিচু অংশে দাঁড়িয়ে মেরামতের কাজ করতে পারতেন। ট্রাকের চালককে এখনও পাওয়া যায়নি। মামলা হয়েছে। তদন্ত চলছে। মালিক কে, তা জানতে বিআরটিএতে আবেদন করা হয়েছে।
জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। এমন প্রশস্ত সড়কে পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়ার কারণ নেই বলে মনে করেন সাইফুন নেওয়াজ। তিনি সমকালকে বলেছেন, দুটি ঘটনা ঘটতে পারে। প্রথমত রংপুর থেকে ঢাকামুখী সবজিবোঝাই ট্রাকটি বাঁ দিক দিয়ে কোনো গাড়িকে ওভারটেক করেছিল। যে কারণে থেমে থাকা বাসকে দেখতে পায়নি। অথবা চালক ঘুমিয়ে পড়েছিল।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ট্রাকের চালক আগের রাতে রংপুর থেকে যাত্রা করেছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো যাবে না; কিন্তু চালক সারারাত গাড়ি চালিয়েছেন। বিকল্প চালক ছিল না ট্রাকে। এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। চালকদের বিশ্রামাগার নির্মাণ বহু বছর ধরে পরিকল্পনায় ঘোরার পর সম্প্রতি পাঁচটি নির্মাণের প্রকল্প কাজ শুরু হয়েছে।
মহাসড়কে মূল অংশের পর শোল্ডারে খাঁজকাটা অংশ থাকে। যাকে 'রাম্বল স্ট্রিপ' বলে। কোনো চালক অমনোযোগী হয়ে মূল সড়ক থেকে শোল্ডারে চলে গেলে 'রাম্বল স্ট্রিপে' গাড়িতে ঝাঁকুনি তৈরি হয়। ফলে চালক মূল সড়কে ফিরে আসার সুযোগ পায়। দুর্ঘটনাস্থল থেকে জানা গেছে, সেখানে রাম্বল স্ট্রিপ ছিল না।
দায়িত্বে থাকা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সারাদেশে ৫০০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কে 'রোড সেফটি অডিট' করেছে। আরও ৩০০ কিলোমিটারে অডিট চলমান রয়েছে। সওজের টেকনিক্যাল সার্ভিস উইং এ নিরীক্ষা করছে। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অডিটেই গলদ রয়েছে। সারা পৃথিবীতে নিরীক্ষার কাজ করা হয় স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান দিয়ে। কিন্তু সওজ নিজের রাস্তা নিজেই নিরীক্ষা করছে। ফলে গলদ থাকলেও তা ধরার সম্ভাবনা কম। তবে এ বিষয়ে সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (টেকনিক্যাল সার্ভিস) ড. আবদুল্লাহ আল মামুনের বক্তব্য জানা যায়নি।
দুর্ঘটনার আরেক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মোটরসাইকেল। শুক্রবার অন্তত পাঁচজনের প্রাণ গেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। প্রতিদিন এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেছেন, মোটরসাইকেল মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড অতিরিক্ত মোটরসাইকেলের জন্য যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, বাংলাদেশকে একই পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়।
বিআরটিএতে নিবন্ধিত ৪৫ লাখ যানবাহনের মধ্যে ২৯ লাখই মোটরসাইকেল। শুক্রবার রাজধানীতে নিহত হন ১৮ বছর বয়সী কলেজছাত্র ইফতেখার খলিল ইফতি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনুযায়ী অল্প বয়সে গতির নেশা থাকে। তরুণদের জন্য মোটরসাইকেল প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। এদিকে নজর দিতে হবে এখনই। নছিমন, করিমন, ভটভটির মতো যানবাহন উচ্ছেদ করতে হবে।
আগামী দিনগুলোতে শীত আরও বাড়বে, কুয়াশাও বাড়বে। তখন আরও বেশি দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকবে। ঘন কুয়াশায় দুর্ঘটনা এড়াতে 'ফগ লাইট' জ্বালিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। ফগ লাইট ঠিক না থাকলে আইনানুযায়ী জরিমানা হওয়ার কথা, গাড়ির ফিটনেস পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু 'ফগ লাইট' কার্যকর নয়, এমন গাড়িও সড়কে বিনা বাধায় চলছে, দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার সমকালকে বলেছেন, ফিটনেসের বিষয়ে তারা আগের চেয়ে অনেক কঠোর হয়েছেন। যেনতেনভাবে আর ফিটনেস পাওয়া যাবে না।
- বিষয় :
- অনিয়ম
- সড়ক
- সড়কে ঝরছে প্রাণ
- মহাসড়ক
