প্রসঙ্গ লাকিংমে চাকমা-৩
অপরাধ ঢাকার তদন্ত
রাজীব নূর
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫:৪৮
'লাকিংমে চাকমাকে কেউ অপহরণ করেনি, সে নিজেই পালিয়ে গেছে।' পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলার তদন্তে এ রকম একটা উপসংহার টেনেছিল। পিবিআই গত বছরের ৯ আগস্ট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদন জমা হওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই এ তদন্তের বিরুদ্ধে মামলার বাদী লাকিংমের বাবা লালাঅং চাকমা নারাজি দিয়েছিলেন। তার নারাজিটি কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) একরামুল হুদা আদালতের গোচরে এনেছেন লাকিংমের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পাঁচ দিন পর গত ১৫ ডিসেম্বর। লাকিংমে চাকমার ওপর ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার তথ্যানুসন্ধানে গত ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর কক্সবাজার ও টেকনাফ ঘুরে আসা শিক্ষক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও আদিবাসী নেতাদের একটি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা মামলার তদন্তে চরম গাফিলতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ আনেন। তারা গাফিলতির অভিযোগ এনেছেন পিপি একরামুল হুদার বিরুদ্ধেও। তারা বলছেন, 'অর্পিত দায়িত্ব পালন করলে সহজেই লাকিংমেকে উদ্ধার করতে পারতেন তদন্ত কর্মকর্তা। তদন্ত কর্মকর্তা ক্যশৈনু মারমার দেওয়া প্রতিবেদনটি পড়লে মনে হয়, এটা অপরাধ ঢাকার তদন্ত। অথচ এই আসামিদের ঠিকঠাক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে জানতে পারতেন, লাকিংমেকে কুমিল্লায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যদি পিপি নারাজিটি যথাসময়ে আদালতে উপস্থাপন করতেন, তাহলে হয়তো অধিকতর তদন্তে খুঁজে পাওয়া যেত মেয়েটিকে।'
লাকিংমে অপহৃত হয়েছে গত বছরের ৫ জানুয়ারি; কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শিলখালি চাকমাপাড়া থেকে। অপহরণের এক দিন পর লাকিংমের বাবা লালাঅং চাকমা মামলা করতে টেকনাফ থানায় গিয়েছিলেন। ওই থানাটিতে তখন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা হত্যার দায়ে বরখাস্ত এবং বর্তমানে কারান্তরীণ প্রদীপ কুমার দাশ। লালাঅং জানান, থানা মামলা নেয়নি। তিনি নিশ্চিত, ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তার মেয়েকে আশপাশে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তিনি যখন যেখানে মেয়েকে রাখা হয়েছে বলে খবর পেয়েছেন, সেখানেই ছুটে যাচ্ছিলেন বলে অপহরণকারীরা ৮ জানুয়ারি বিকেলে লাকিংমেকে শাহপরীর দ্বীপে নিয়ে যায়। ৯ জানুয়ারি সকালে তিনি টেকনাফ থানাকে লিখিতভাবে জানান, তার মেয়েকে শাহপরীর দ্বীপের মাঝেরপাড়ায় কালা মনুর বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছে। পুলিশ সহযোগিতা না করায় নিজেই গিয়েছিলেন মেয়েকে খুঁজতে এবং অপহরণকারীদের কাছে নিগৃহীত হয়ে ফিরে এসেছিলেন।
পুলিশ মামলা নিতে রাজি না হওয়ায় ২৭ জানুয়ারি কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মেয়েকে উদ্ধারের জন্য মামলা করেন লালাঅং চাকমা। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে কক্সবাজারের পিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। পিবিআই গত বছরের ৯ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, লাকিংমে চাকমা অপহরণের অভিযোগে সত্যতা পাওয়া যায়নি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই কক্সবাজার ইউনিটের পরিদর্শক (নিরস্ত্র) ক্যশৈনু মারমার দেওয়া দুই পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি, লাকিংমে চাকমা নামের হারিয়ে যাওয়া মেয়েটি অপ্রাপ্তবয়স্ক।
সমকালের সঙ্গে আলাপে ক্যশৈনু মারমা বলেন, বয়সের উল্লেখ না থাকলেও প্রতিবেদনে মেয়েটি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী উল্লেখ রয়েছে, যা থেকে সে যে অপ্রাপ্তবয়স্ক, তার ধারণা পাওয়া যায়। অপ্রাপ্তবয়স্ক একটি মেয়ে যদি নিজেই কোথাও চলে যায়, মেয়েটি কোথায় আছে তা খোঁজার দায়িত্ব তারও কিনা- এ প্রশ্ন এড়িয়ে যান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তবে মেয়েটিকে খুঁজে না পাওয়ায় তার খারাপ লেগেছে জানিয়ে বলেন, 'তদন্তের ভার পেয়ে পাঁচ-ছয় মাস চেষ্টা করার পর ৯ আগস্ট প্রতিবেদন দিয়েছি আমি।'
পিবিআইর প্রতিবেদনে বলা হয়, অংকহদ্মা চাকমা নামের একজন লাকিংমেকে তার বান্ধবী নাছিমা আক্তার, নাছিমা আক্তারের বন্ধু রিয়াজ উদ্দিন এবং অভিযুক্ত একজন আসামি আব্বুইয়াকে একসঙ্গে একটি বাগানে দেখে ফেলায় সম্ভাব্য পরিণতির ভয়ে লাকিংমে বাড়ি থেকে অজ্ঞাত জায়গায় চলে যায়। অথচ অন্তত পাঁচজন সাক্ষী জবানবন্দিতে বলেছিলেন, লাকিংমেকে তার বাড়ি থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আদালতে প্রতিবেদন জমা হওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই লাকিংমে চাকমার পরিবার নারাজি দেয়। নারাজিতে সাক্ষী অংকহদ্মা চাকমা, উথাইন চিং চাকমা, এলামং চাকমা ও এচিং চাকমার বক্তব্য অস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানানো হয়। নারাজিতে 'বরং আসামিদের পক্ষে অবৈধ বশে গিয়া মনগড়া, ভিত্তিহীন, বানোয়াট জবানবন্দি লিপি করিয়া তদন্ত প্রতিবেদন সৃজন' করে জমা দিয়েছেন বলে তদন্ত কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়।
গাফিলতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, 'লাকিংমে চাকমার বাবা তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেছিলেন। মামলায় আতাউল্লাহর নাম ছিল না। তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে প্রমাণ হয়নি। তারা নিরীহ মানুষ। এজাহারে যে পাঁচজনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে, তারা লাকিংমে চাকমার আত্মীয় বলে তাদের সাক্ষ্য কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি এই সাক্ষীদের ছাড়াও প্রত্যক্ষদর্শী এবং এলাকার বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। ওই পাঁচ সাক্ষী ছাড়া এলাকার আর কেউ অপহরণের কথা বলেনি।'
লাকিংমে চাকমার ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনার তথ্যানুসন্ধানকারী দলের সদস্যরা জানান, খোঁজখবর করে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, পিপি একরামুল হুদা নারাজিটি আদালতে উপস্থাপন করেছেন লাকিংমের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর লাশ নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে। তারা বলেন, 'শুধু তাই নয়, লাকিংমের মরদেহ সৎকারের দাবি নিয়ে ওর বাবা লালাঅং চাকমা এবং অপহরণকারী হিসেবে অভিযুক্ত ও কথিত স্বামী আতাউল্লাহ আদালতে গেলে পিপি আতাউল্লাহর পক্ষাবলম্বন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।' কেন এটা করেছেন- জানতে চাইলে পিপি একরামুল হুদা সমকালের কাছে ঘটনার স্পর্শকাতরতা বুঝতে পারেননি বলেই নারাজি উপস্থাপনে বিলম্ব হয়েছে বলে স্বীকার করেন। তিনি ৩ নম্বর আদালতে বিচারক না থাকাকেও একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
৩ নম্বর আদালত বলতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালকে বুঝিয়েছেন পিপি। অবশেষে এই আদালতই মামলাটি তদন্তের জন্য র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব) দিয়েছে। র্যাব-১৫ গত রোববার প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলে আদালত মরদেহ বাবার জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশ দেন। লাকিংমে চাকমার বাবা লালাঅং ও মা কেচিং চাকমা গতকাল সোমবার লাশ গ্রহণ করেন। লাকিংমে চাকমার ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনার তথ্যানুসন্ধানকারী দলের সদস্যরা র্যাবের তৎপরতায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, 'আশা করছি, হতদরিদ্র পরিবারটির বিচার পাওয়ার জন্য ছোটাছুটির অবসান হবে এবার।'
- বিষয় :
- লাকিংমে চাকমা
- চাকমা
- তদন্ত
- লাকিংমে
- অপরাধ
