বীরত্বগাথার স্বীকৃতি চান কাঞ্চন সিকদার
আবু সালেহ রনি
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৮
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ কাঞ্চন সিকদার। একাত্তরে যুদ্ধ শুরুর আগে
পাকিস্তান বাহিনীর সার্জেন্ট ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর
চাকরিতে যোগ না দিয়ে অস্ত্র তুলে নেন দেশের টানে। প্রশিক্ষণ দেন মুক্তিকামী
যোদ্ধাদের। ৯ নম্বর সেক্টরে হেয়ায়েত উদ্দিন এবং শাজাহান ওমরের বাহিনীর হয়ে
যুদ্ধ করেন তিনি। একাত্তরের ২২ অক্টোবর বরিশালের বাটাজোরে পাকিস্তান
বাহিনীর ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিতে গিয়ে কাঞ্চন সিকদার বাঁ পা হারান। তবে এখনও
জীবনযুদ্ধ থামেনি তার।
কাঞ্চন সিকদার সমকালকে বলেন, 'কৃত্রিম পা থাকলেও সেটা দিয়ে ঠিকমতো চলা যায়
না। একা বের হতে পারি না। সঙ্গে কাউকে না কাউকে রাখতে হয়। এ যে কত কষ্টের,
যার গেছে সেই জানে!' তার আক্ষেপ, একাত্তরে পাকিস্তানি অস্ত্রবাহী জাহাজ লুট
করার পর মেজর জলিল ক্যাম্পসভায় বলেছিলেন, তাকে খেতাব দেওয়া হবে। পরে আর
সেই খেতাব মেলেনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন একটাই চাওয়া তার- সরকার
মুক্তিযুদ্ধে তার বীরত্বগাথার মূল্যায়ন করুক। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা
সার্জেন্ট মোহাম্মদ কাঞ্চন সিকদারের বাড়ি বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার
আশুকাঠি গ্রামে। ১৯৫৪ সালের ৫ এপ্রিল সেখানেই জন্ম হয় তার। বাবা চান উদ্দিন
সিকদার ব্যবসায়ী এবং মা করিমুন নেছা গৃহিণী ছিলেন। দুই ভাই ও তিন বোনের
মধ্যে দ্বিতীয় কাঞ্চন ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কাঞ্চন সিকদার বলেন,
''একাত্তরের জানুয়ারির শেষের দিকে দু'মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলাম। তারপর
ফেব্রুয়ারিতে পরিবারের সিদ্ধান্তে বিয়ে করি আলফাতুন বেগমকে। মার্চের
মাঝামাঝি পর্যন্ত ছুটি নিয়েছিলাম। কিন্তু তা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ ঢাকায়
রিপোর্ট করার নির্দেশ দেয় হেডকোয়ার্টার্স। তবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের
পর সেনাব্যারাকে ফিরে যেতে অনেকটাই শঙ্কিত ছিলাম। এরই মধ্যে আসে ২৫
মার্চের কালরাত। সে রাতের ভয়াবহ নৃশংসতার কথা জেনে মেজর জলিলের সঙ্গে দেখা
করি। তিনিও তখন ছুটিতে ছিলেন। তিনি বলেন, 'কাঞ্চন, যুদ্ধ লেগে গেছে। তুমি
ছাত্র-যুবকদের ট্রেনিং দাও।' তার নেতৃত্বে বরিশালের বঙ্গবন্ধু উদ্যানে
(বেলস পার্ক ) প্রায় পাঁচশ' ছাত্র-যুবক-জনতাকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করি।'
মেজর জলিলের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে কাঞ্চন সিকদার বরিশালের দপদপিয়া নদীতে
পাকিস্তানি অস্ত্রবাহী জাহাজ লুট করেন। এ ঘটনা তখন দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক
চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এ প্রসঙ্গে কাঞ্চন সিকদার বলেন, 'মে মাসের শুরুর দিকে
খুলনা থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ে বরিশাল
হয়ে ঢাকায় যাচ্ছিল। এমন তথ্য পেয়ে আমরা ঘটনার দিন দুপুরের দিকে জাহাজটি
বরিশালের দপদপিয়া অতিক্রম করার সময় অতর্কিতে হামলা চালাই। খুব সহজেই
জাহাজটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। এ অপারেশনে ওই জাহাজে থাকা দুজন পাকিস্তানি
কর্মকর্তা মারা যায়। জাহাজ থেকে আমরা এসএলআর, মেশিনগান, স্টেনগানসহ প্রচুর
অস্ত্রও পেয়েছিলাম। যা পরে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত হয়।'
একাত্তরে ৯ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ করেন কাঞ্চন সিকদার। এই সেক্টরে
প্রথমে তিনি তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার হেমায়েত উদ্দিন এবং
পরে মেজর শাজাহান ওমরের বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ
অবদানের জন্য স্বাধীনতার পর তারা দুজনেই বীরবিক্রম উপাধিতে ভূষিত হন।
এ দুই বাহিনীর হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে কাঞ্চন বলেন, 'এপ্রিলের
মাঝামাঝি হেলিকপ্টারে করে পাকিস্তানি সেনারা নামে বরিশাল শহরে। কারণ সড়কপথে
শহরে ঢোকার ব্রিজগুলো আমরা ভেঙে দিয়েছিলাম। পাকিস্তানিরা এতে প্রচণ্ড
ক্ষিপ্ত হয় এবং বিশেষ করে ২৮ এপ্রিল এ অঞ্চলে ব্যাপক গণহত্যাযজ্ঞ চালায়।
এমন পরিস্থিতিতে বরিশাল থেকে চলে আসি ফরিদপুরে। যোগ দিই হেমায়েত বাহিনীতে।
আমার কমান্ডে ছিল ৫০ জন। প্রথম দিকে অস্ত্রের সংকট ছিল প্রবল। কিন্তু
পাকিস্তানি বাহিনী ও থানাগুলোতে অপারেশন চালিয়ে তাদের অস্ত্র সংগ্রহ করে
আমরা সেগুলো দিয়ে ছোট ছোট অপারেশন চালাতে থাকি। এভাবে ওই গ্রুপটিকে সংগঠিত
করে দিয়ে মে মাসে চলে আসি মেজর শাহজাহান ওমরের কাছে। কারণ খবর পেয়েছিলাম
আমার এলাকা গৌরনদীর বাটাজোরে পাকিস্তানিরা ক্যাম্প করেছে। মেজর শাহজাহানের
নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ছিল উজিরপুরের বরাকোঠায়। নৌকা ছাড়া
সেখানে যাওয়ার উপায় ছিল না। তাই কয়েক মাস সেখানে থেকে পাকিস্তানিদের
প্রতিহত করি।'
মেজর শাজাহান ওমরের নেতৃত্বে কাঞ্চন সিকদারসহ মুক্তিযোদ্ধারা গৌরনদীর
বাটাজোরে পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে সাধারণ রাত একটা, তিনটা, পাঁচটা,- এমন সময়
নির্বাচন করে আক্রমণ চালাতেন। এ ছাড়াও গৌরনদী, ঝালকাঠি ও ফরিদপুরের
বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেছেন কাঞ্চন সিকদার। তবে ২২ অক্টোবর পাকিস্তানিদের
ক্যাম্পের হামলাই হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধে তার শেষ যুদ্ধ।
এ প্রসঙ্গে কাঞ্চন সমকালকে বলেন, 'সেদিন আমাদের ওপর নির্দেশ এলো,
পাকিস্তানিদের বাটাজোর ক্যাম্প দখলের। রাত তখন ২টা। তিনটি গ্রুপ করা হলো-
প্রত্যেকটিতে দেওয়া হলো ২৫ জন করে। আমি নিজেও একটি গ্রুপের কমান্ডে। আমার
সঙ্গে ছিলেন ট্যাঙ্ক রেজিমেন্টের সার্জেন্ট হায়দার, সুবেদার গোলাম মোস্তফা,
এসমত আরা রাসু, পুলিশের দারোগা মতিন ও লতিফ। তিনটি নৌকায় করে তিন গ্রুপ
রওনা হলাম। পাকিস্তানিরা তাদের ক্যাম্পের কাছাকাছি পোস্ট অফিস থেকে
ওয়্যারলেসে যোগাযোগ করত। পরিকল্পনা ছিল- একটি গ্রুপ গৌরনদীর উত্তরের সেই
পোস্ট অফিসে গ্রেনেড চার্জ করে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে, আরেকটি
গ্রুপ দক্ষিণে পজিশন নেবে,- যাতে বরিশালের শিকারপুর থেকে পাকিস্তানি সেনারা
চলে এলে তাদের ঠেকানো যায়। আর মাঝখানে অবস্থান নেওয়া আমার গ্রুপ ক্যাম্প
আক্রমণ করে দখলে নেবে।'
কাঞ্চন জানান, চারআনির পুলের কাছে তারা নৌকা ছেড়ে হাঁটতে শুরু করেন। তখন
ভোর ৪টা। ছোট্ট একটি খাল পেরিয়ে পাকিস্তানিদের ক্যাম্পের পাশে পজিশন নিয়ে
তাদের গ্রুপটি অপেক্ষা করতে থাকে। উত্তর দিকের গ্রুপটি তখন পোস্ট অফিসে
গ্রেনেড চার্জ করে। কমিউনিকেশন কাট-আপ হতেই তারা 'জয় বাংলা' স্লোগান তোলে।
তাদের গ্রুপটি তখন ফায়ার ওপেন করেন। কাঞ্চন জানান, ওই সময় তার অবস্থান ছিল
একটি নারকেলগাছের গোড়ায়। সঙ্গে ছিল নাইনটি ফোর এনারগা (এসএলআরের মাথায়
প্রজেক্টর দিয়ে চার্জ করার অস্ত্র)। এটি দিয়ে ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ফায়ার
করতেই সেটি গিয়ে পড়ে পাকিস্তানিদের বাঙ্কারের ওপর। এ সময় পাকিস্তানিদের
এলএমজির গুলিতে তার সামনের নারকেল গাছটি দু'ভাগ হয়ে গেলে তিনি টার্গেটে পড়ে
যান। নিজেকে রক্ষা করতে তিনি তার সেকেন্ড পজিশন পাশের আমগাছের গোড়ায় লাফ
দেন। ওই সময়ই তার বাঁ পায়ে ব্রাশফায়ারের গুলি লাগে। এতে পায়ের হাড় উড়ে যায়।
তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তার সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে পা শক্ত করে বেঁধে নেন।
সহযোদ্ধা হায়দার তার ডান পা ধরে টেনে খালের মধ্যে নিয়ে যান। এ সময় হায়দারও
গুলিবিদ্ধ হন। অন্য সহযোদ্ধারা এগিয়ে উদ্ধার করেন তাদের দু'জনকে। নিয়ে যান
পাশের গ্রামে রহম আলী কারিগরের বাড়িতে। এভাবেই শেষ হয়ে যায় কাঞ্চনের
মুক্তিযুদ্ধ!
আহত কাঞ্চন সিকদারের পায়ের নিচের দিকটুকু কেটে ফেলে দিতে হয়। পরে গৌরনদীর
একটি ক্যাম্পে নিয়ে রাখা হয় তাকে। খবর পেয়ে তার মা ও স্ত্রী আসেন। কিন্তু
রাজাকারদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পাকিস্তানি বাহিনী সেখানে তাদের ক্যাম্পে
হামলা চালায়। আত্মগোপন করেন যুদ্ধাহত কাঞ্চন। প্রায় দেড় মাস পর স্বাধীন হয়
দেশ।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধাহতদের উন্নত চিকিৎসার উদ্যোগ নেন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমান। কাঞ্চন সিকদারকে তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও
সিএমএইচে চিকিৎসার পর সরকারিভাবে পাঠানো হয় পোল্যান্ডে। চিকিৎসার পর থেকে
কৃত্রিম পা ও হুইলচেয়ারই তার ভরসা। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর
থিওরেটিক্যাল ইন্সট্রাক্টর হিসেবে অবসর নেন তিনি। তিন ছেলের জনক কাঞ্চন
সিকদার স্বাধীন দেশ ও তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশা করেন, মুক্তিযুদ্ধের
চেতনাকে তারা আরও এগিয়ে নেবে। তাতেই মুক্তিযোদ্ধারা শান্তি পাবেন। এই সরকার
যেভাবে দেশ চালাচ্ছে, তাতে তিনি আনন্দিত। কাঞ্চন চান, দেশের নাম ছড়িয়ে
পড়ূক বিশ্বজুড়ে।
- বিষয় :
- যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা-৭
