জাতিসংঘ মিশন
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের বিরল অর্জন কঙ্গোয়
সাহাদাত হোসেন পরশ ডিআর কঙ্গোর ইতুরি থেকে
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:২২
আফ্রিকা মহাদেশ বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ। এখানকার ইতিহাস, সংস্কৃতি,
ভাষা, ঐতিহ্য, রীতিনীতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, আচার-ব্যবহার পৃথিবীর অন্য যে
কোনো অঞ্চলের তুলনায় আলাদা। এটা তাদের পৃথক পরিচিতি দিয়েছে। মধ্য আফ্রিকার
একটি দেশ হলো ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গো। দেশটি ডিআর কঙ্গো বা
ডিআরসি নামেও পরিচিত। ১৬টি প্রদেশ নিয়ে বিশাল এই দেশ। আয়তনে বাংলাদেশের
প্রায় ১৬ গুণ। এটি আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। বর্তমানে দুনিয়ার
দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি হলো ডিআর কঙ্গো। প্রায় ৯ কোটি লোকের বসবাস এখানে।
জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ ভাগই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে।
মূল্যবান খনিজসম্পদের এক বিশাল আধার ডিআর কঙ্গো। ডায়মন্ড, স্বর্ণ, জিরকনের
মতো দামি খনিজসম্পদ রয়েছে ডিআর কঙ্গোর মাটির নিচে। রয়েছে তেলও। তবে দেশটির
জাতিগত সংঘাতের রক্তাক্ত ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত
দেড়শ' সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে। দেশটিতে রয়েছে আড়াইশ' ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।
স্বার্থতাড়িত নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়ে প্রায়ই খুনাখুনির ঘটনা ঘটে এখানে।
পাশাপাশি কঙ্গোকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে ঘাতক ব্যাধি ইবোলা।
মধ্য আফ্রিকার এই বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ২০০৩ সাল থেকে
সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন ব্লু হেলমেটধারী বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অধীনে ১৬ বছর ধরে ডিআর কঙ্গোতে বাংলাদেশি
শান্তিরক্ষীরা যে নজির স্থাপন করেছেন তা এক কথায় অনন্য। এখানে অন্যান্য
দেশের শান্তিরক্ষীদের কাছেও বাংলাদেশি সেনারা এক ধরনের উদাহরণ। কর্মনিষ্ঠা,
আত্মত্যাগ, শ্রম, উদ্যম, চারিত্রিক গুণাবলি, ন্যায়নিষ্ঠতা বাংলাদেশি
শান্তিরক্ষীদের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
কঙ্গোয় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ১৪ জন বাংলাদেশি
শান্তিরক্ষী জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের মধ্যে ১১ জন নিহত হয়েছেন সশস্ত্র
গ্রুপের অতর্কিত হামলায়। বাকি তিনজন মারা যান অসুস্থতাজনিত কারণে। নিহতদের
স্মরণে কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশের বুনিয়ায় এনদ্রোমো ক্যাম্পে একটি স্মৃতিসৌধ
নির্মাণ করা হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের কার্যক্রমে সংশ্নিষ্ট যারাই
ইতুরি পরিদর্শন করেন, সবাই ওই স্মৃতিসৌধে ফুলেল শ্রদ্ধা অর্পণ করেন। এই
স্মৃতির মিনার বাংলাদেশের এক অহঙ্কার। এখানে দাঁড়ালে আজও বাংলাদেশি
শান্তিরক্ষীরা তাদের পূর্বসূরিদের গৌরবগাথাকে হৃদয়ে ধারণ করে আগামীর পথচলায়
নতুন প্রেরণা পান। এখানে আছে ভয়কে জয় করার দৃপ্ত অঙ্গীকার।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে কঙ্গোয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা কী মানদণ্ড
অর্জন করেছেন তা পরিস্কার হলো একটি ছোট্ট পরিসংখ্যান থেকে। এই পরিসংখ্যান
জানলে যে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের বুক গর্বে ভরে উঠবে।
প্রতি বছর দু'বার অপারেশনাল কার্যক্রম ও কার্যকর ভূমিকার মানদণ্ড নির্ণয়
করে প্রত্যেক দেশের শান্তিরক্ষীদের পৃথকভাবে মূল্যায়নপত্র দেওয়া হয়। কঙ্গোয়
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের 'র্যাপিডলি ডেপ্লয়েবল ব্যাটালিয়ন' (দ্রুত
মোতায়েনযোগ্য বাহিনী) এই বছর তাদের কাজের মূল্যায়নে ১০০ নম্বরের ভেতরে
পেয়েছে ৯৪ দশমিক ০৮। ফোর্স হেডকোয়ার্টার থেকে অন্য দেশের প্রতিনিধিরা এই
মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
কঙ্গোর শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ইতিহাসে অন্য কোনো দেশের ব্যাটালিয়ন এমন
অনন্য অর্জন করতে পারেনি। এটা বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের এক অনন্যসাধারণ
অর্জনই বলা চলে। এই ব্যাটালিয়ন ব্যান-আরডিবি হিসেবে পরিচিত। ২০১৮ সালে
কঙ্গোয় প্রথমবারের মতো ব্যান-আরডিবির কার্যক্রম শুরু করেন বাংলাদেশের
শান্তিরক্ষীরা।
ইতুরি প্রদেশে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা যে এলাকায় নিয়োজিত তা এক বিশাল
অঞ্চল। আকারে বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় তৃতীয়াংশ। ইতুরি প্রদেশের
দৈর্ঘ্য প্রায় ছয়শ' কিলোমিটার। এর মধ্যে মাত্র ৫ কিলোমিটার রাস্তা পাকা। এই
পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে কত দুর্গম এলাকায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা
কার্যক্রম বিস্তৃত করেছেন।
ডিআর কঙ্গোর বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সাফল্য ও অবদানের গৌরবগাথা দেখতে গত ৫
ডিসেম্বর দেশটিতে আসেন কয়েকজন বাংলাদেশি সাংবাদিক। আট সদস্যের এই দলের
নেতৃত্বে রয়েছেন আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালক লে. কর্নেল
আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ। বাংলাদেশ থেকে উগান্ডা হয়ে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার
দূরের এই দেশটিতে পৌঁছতে সময় লেগেছে প্রায় দেড় দিন। উগান্ডার এনটেবে থেকে
ইতুরিতে সরাসরি বাণিজ্যিক ফ্লাইট নেই। তাই জাতিসংঘের ভাড়া করা বিমানের
শিডিউল পেতে এনটেবেতে এক দিন কাটাতে হয় প্রতিনিধি দলকে। ইউনাইটেড নেশনস
অর্গানাইজেশন স্টাবিলাইজেশন মিশন ইন দ্য ডিআর কঙ্গো (মনুস্ক) নামের এ
কার্যক্রমে বর্তমানে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী রয়েছেন ১৩৬০ জন।
দেশটির ছয়টি প্রদেশকে চারটি সেক্টরের ভাগ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের
শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালন করছেন। এগুলো হলো- নর্দার্ন, ওয়েস্টার্ন,
সেন্ট্রাল ও সাউথ সেক্টর। গৌরবের বিষয় হলো নর্দার্ন সেক্টরে অন্য যেসব
দেশের শান্তিরক্ষী কাজ করেন তাদেরও টিম লিডার বাংলাদেশের ব্রিগেডিয়ার
জেনারেল চৌধুরী মোহাম্মদ আজিজুল হক হাজারী। বাংলাদেশ ও মরক্কোর প্রায় দুই
হাজার শান্তিরক্ষী সরাসরি তার তত্ত্বাবধানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে
কাজ করে যাচ্ছেন। ইতুরিতে নেপালি শান্তিরক্ষীরাও নর্দার্ন সেক্টরের
কমান্ডারের তত্ত্বাবধানে কাজ করছেন।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি সংঘাতময় দেশে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে একজন
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তা সত্যি গৌরবের। এই অর্জন
কঙ্গোয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নতুন মর্যাদার আসন দিয়েছে। তাই কঙ্গোয়
অন্য দেশের শান্তিরক্ষীরাও বাংলাদেশিদের আলাদা দৃষ্টিতে দেখে থাকেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজুল হক হাজারী বাংলাদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে
শান্তিরক্ষীদের চ্যালেঞ্জ, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অর্জন ও গৌরবগাথার
নানা তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে দেশটির অন্তত সাতটি সশস্ত্র
গ্রুপকে মোকাবিলা করে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাপনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। এক সময় দিনে-রাতে ইতুরিতে ছিনতাই, রাহাজানি,
খুনাখুনি লেগে থাকত। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নিয়মিত প্যাট্রলসহ নানা
কার্যক্রমের কারণে এসব অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। প্রতি মাসে গড়ে
সহস্রাধিক অভিযান পরিচালনা করছে র্যাপিডলি ডেপ্লয়েবল ব্যাটালিয়ন।
এই সেক্টর কমান্ডার আরও জানান, ডিআর কঙ্গোর সেনাবাহিনী, পুলিশ, স্থানীয়
গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে এখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক
রাখতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। কোনো ধরনের
ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে নির্ভরতার প্রতীকে
পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের ব্লু হেলমেটধারীরা।
আইএসপিআরের পরিচালক লে. কর্নেল আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ সমকালকে বলেন,
বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা তিন দশকের বেশি সময় ধরে গৌরবময়
ইতিহাসের অংশ হয়েছে। এই অর্জন বাংলাদেশের। শান্তিরক্ষার পাশাপাশি নিজ
দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতেও তারা অবদান রাখছেন।
কঙ্গোয় শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত লে. কর্নেল কামাল পাশা জানান,
শান্তিরক্ষীদের প্রায়ই দুর্গম এলাকায় যেতে হয়। ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে
সশস্ত্র গ্রুপের এক অ্যাম্বুসে (অতর্কিত হামলায়) ৯ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী
নিহত হন। তাদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের উদ্দীপনা ও সাহস
জোগাচ্ছে।
- বিষয় :
- জাতিসংঘ মিশন
