ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কঙ্গোয় শান্তিরক্ষা মিশন

ওদের মুখেও 'বাংলা ভালোবাসি'

ওদের মুখেও 'বাংলা ভালোবাসি'
×

সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের অংশ হিসেবে বুনিয়ার এনদ্রোমা ক্যাম্পের মাঠে বুনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সঙ্গে ভলিবল খেলছিলেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ফিমেল এনগেজমেন্ট টিমের সদস্যরা। খেলা শেষে ফটোসেশন- প্রতিবেদক

সাহাদাত হোসেন পরশ, ডিআর কঙ্গোর ইতুরি থেকে

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:২৪ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:৫১

'আমি বাংলায় ভালোবাসি/ আমি বাংলাকে ভালোবাসি/ আমি তারই হাত ধরে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে আসি/ আমি যা কিছু মহান বরণ করেছি বিনম্র শ্রদ্ধায়/ মিশে তেরো নদী, সাত সাগরের জল গঙ্গায়-পদ্মায়/ বাংলা আমার তৃষ্ণার জল, তৃপ্ত শেষ চুমুক/ আমি একবার দেখি, বারবার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।'

বাঙালি ও বাংলা ভাষা নিয়ে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের লেখা বিখ্যাত গানের এ পঙ্‌ক্তি শোনা গেল বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭ হাজার মাইল দূরের মধ্য আফ্রিকার দেশ ডিআর কঙ্গোতে। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া কয়েকজন ছাত্রী প্রায় হুবহু গাইলেন এই গান।

এই শিক্ষার্থীরা কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশের বুনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। তারা যখন একসঙ্গে বাংলা নিয়ে এমন মায়াভরা উচ্চারণ করলেন, তখন সেখানে উপস্থিত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী ও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীরা আবেগাপ্লুত হন। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের হাত ধরে স্থানীয়দের মুখেও বাংলায় শোনা গেল 'বাংলা ভালোবাসি'। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নন; বুনিয়ার আশপাশে বাঙালি  শান্তিরক্ষীদের দেখলে স্থানীয় অনেকেই বলে ওঠেন, 'বন্ধু কেমন আছ? আমি ভালো আছি।'

কঙ্গো সফরে আসা বাংলাদেশি সাংবাদিকদের শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যার দিকে নিয়ে যাওয়া হয় ইতুরি প্রদেশের পাহাড় ঘেরা নৈসর্গিক শহর বুনিয়ায়। বিশাল পাহাড়ের বুকে ছোট ছোট কাঁচা ও আধা পাকা ঘর। ছোট্ট শিশুরা রাস্তার পাশে ও মাঠে খেলাধুলা বন্ধ করে ঘরে ফিরছিল। লাল টকটকে সূর্যও প্রস্তুতি নিচ্ছিল পাহাড়ের আড়ালে  ঘুমিয়ে পড়ার। বক ও অন্য পাখিদেরও ঘরে ফেরার যেন বড্ড তাড়া। দিনের ব্যস্ততা শেষে ওরা দল বেঁধে ছুটছিল। তবে তখনও বুনিয়ার এনদ্রোমো ক্যাম্পের বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের খেলার মাঠ থেকে ভেসে আসছিল বাংলা সুর।

কঙ্গোর তরুণীদের এ সুরের আবেশ পাহাড় ভেঙে ছড়িয়ে যাচ্ছিল আরও বহু দূরে। কয়েক হাজার মাইল দূরে ডিআর কঙ্গোয় বসে লাল-সবুজের বাংলাদেশের এমন জয়ধ্বনি শুনতে কার না ভালো লাগে!

বুনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীরা গোধূলিলগ্নে যখন বাংলাদেশকে ভালোবাসার কথা জানাচ্ছিলেন, তখন এনদ্রোমো ক্যাম্পের সবুজ মাঠে বাংলার লাল-সবুজের পতাকা পতপত করে উড়ছিল। তার পাশেই ছিল জাতিসংঘ ও ডিআর কঙ্গোর পতাকা। বিজয়ের মাসে বিদেশের মাটিতে লাল-সবুজের পতাকার এমন সমুজ্জ্বল উপস্থিতি সত্যিই গর্বের।

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সংঘাতময় কঙ্গোতে শান্তিরক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে তৈরি করেছেন অসাধারণ মেলবন্ধন। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে একে অন্যকে জানার নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে এই দেশে। এরই আলোকে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের 'ফিমেল এনগেজমেন্ট টিম (এফইটি)'-এর সদস্যরা বুনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন ছাত্রীকে কয়েক মাস ধরে ভলিবল খেলার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এর পরই ভলিবল খেলা জনপ্রিয়তা পায় এখানে। এখন বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষী ও বুনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের মধ্যে মাঝেমধ্যেই ভলিবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়।

শুক্রবারও বুনিয়ার এনদ্রোমো ক্যাম্পে আয়োজন করা হয়েছিল ভলিবল খেলার। তীব্র্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলায় ৩/২ সেটে বাংলাদেশের নারী শান্তিরক্ষীরা জয়ী হন। খেলা শেষে উভয় দলকে পুরস্কৃত করা হয়। উভয় দলের সদস্যরা একসঙ্গে ফটোশুটে অংশ নেন। উভয় দেশের খেলোয়াড়দের উল্লাস দেখে বোঝার উপায় ছিল না, কারা জয়ী আর কোন দল পরাজিত। হাসি-ঠাট্টা আর আনন্দে মেতে উঠছিলেন কঙ্গোর তরুণীরা। এমনকি খেলা চলাকালেও দর্শক সারি থেকে বাঙালি শান্তিরক্ষীরা যেভাবে হাততালি পেয়েছেন, তাতে বোঝার উপায় ছিল না তারা কোন টিমের সমর্থক! এরই নাম বন্ধুত্ব। এটাই তো স্পোর্টস স্পিরিট!

রানারআপ হিসেবে পুরস্কার নেওয়ার পর বুনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী ভলিবল টিমের সদস্যদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তখনই তারা একযোগে বলে ওঠেন, 'বাংলা ভালোবাসি। আমি বাংলাদেশ ভালোবাসি। বাংলা আমার বন্ধু। বন্ধু কেমন আছ?'

দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ব্লেসিং জানান, বাংলাদেশ শান্তিরক্ষীদের সঙ্গে ভলিবল খেলা বেশ উপভোগ করেন তারা। তাই আমন্ত্রণ পেলেই খেলতে এনদ্রোমো ক্যাম্পের মাঠে ছুটে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয় ফিরে অন্য সহপাঠীদের সঙ্গে আনন্দ শেয়ার করেন। আনন্দময় এই মুহূর্ত স্মরণীয় করে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন ফটোগ্রাফারও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তারা।

ব্লেসিং বলেন, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা অত্যন্ত বন্ধুসুলভ। তারা ভীষণ মানবিকও। শান্তি রক্ষাসহ কঙ্গোয় নানামুখী ইতিবাচক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত তারা। ফুটবল দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। তবে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের মাধ্যমে ভলিবল খেলার প্রতি দিন দিন তাদের আগ্রহ বাড়ছে।

ডিআর কঙ্গোয় শান্তিরক্ষা মিশনের এফইটির প্রথম প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন ক্যাপ্টেন সাবরিনা মমতাজ অনি। তিনি সমকালকে জানান, প্রথমবারের মতো শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে এফইটির নারী সদস্যরা কঙ্গোয় কাজ করে যাচ্ছেন। এটা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ২২ সদস্যের এফইটির সদস্যরা এ মিশনে যোগদানের পর স্থানীয় স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ুথ ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীদের নানা প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

সাবরিনা জানান, মিশন এলাকায় স্থানীয় নারী ও শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সমস্যা জানা ও এর সমাধানের ব্যবস্থা করা এফইটির অন্যতম দায়িত্ব। সামরিক-অসামরিক সম্পর্ক উন্নয়নে তারা ভূমিকা রাখছেন। এ ছাড়া স্থানীয়দের চিকিৎসারও ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য সচেতনতায় নানামুখী প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। জাতীয়-আন্তর্জাতিক দিবসে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে এফইটি।

জানা গেছে, শান্তিরক্ষা মিশনে প্রত্যেকটি ইনফেন্ট্রি কনটিনজেন্টের সঙ্গে এফইটির সদস্য রাখার ওপর জোর দিয়েছে জাতিসংঘ। গত বছর প্রথমবারের মতো কঙ্গোর শান্তিরক্ষা মিশনে এফইটি সদস্যদের পাঠায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

বুনিয়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেল, অধিকাংশ বাসিন্দা আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও খেলাধুলা ও সঙ্গীতচর্চায় ভীষণ আগ্রহী। সাধারণ কঙ্গোলিজদের পকেটে খুব বেশি অর্থ না থাকলেও জীবনকে তারা উপভোগ করেন নানাভাবে। রাস্তায় হাঁটলেই পাশের বাসা-বাড়ি থেকে গান-বাজনার শব্দ শোনা যায়। কঙ্গোর বাসিন্দাদের অনেকেই সন্ধ্যার পর কিছু সময় সঙ্গীতচর্চা করেন। দেশটিতে জাতিগত দাঙ্গা লেগে থাকলেও সাধ্যমতো সন্তানদের লেখাপড়ার দিকেও মনোযোগী অভিভাবকরা। দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেই সন্তানকে শিক্ষিত করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টায় মরিয়া তারা। দেশটিতে এমন গ্রাম পাওয়া দুরূহ, যেখানে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। ওদের সরকারি ভাষা ফরাসি। স্বীকৃত নিজস্ব ভাষার মধ্যে রয়েছে লিঙ্গালা, কঙ্গো, সোয়াহিলি ও তাশিলুভা। অনেকে ইংরেজিও জানেন।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অনন্য ভূমিকায় দারুণ খুশি সাধারণ কঙ্গোলিজরা। তাদের মতে, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। এ কারণে কঙ্গোলিজদের মুখে আজ বাংলাদেশের জয়গান।

আরও পড়ুন

×