ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাবাকে জিপের পেছনে বেঁধে নিয়ে যায়

বাবাকে জিপের পেছনে বেঁধে নিয়ে যায়
×

শাফিয়ী বিল্লাহ্‌ জব্বার

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০১:৪৮ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০২:২২

পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছে নিজের পরিচয় গোপন করেননি। বরং পথ আগলে দাঁড়ানো পাকিস্তানি সেনাদের প্রশ্নের জবাবে দৃঢ়তা দেখিয়েই বলেছিলেন, যাকে তারা খুঁজছে তিনিই সেই আওয়ামী লীগ কর্মী আব্দুল জব্বার। পরিচয় পাওয়ার পর তারা বাবাকে আমার দাদির সামনে থেকে তুলে নিয়ে যায়।

বাবাকে অকথ্য নির্যাতনের পর দড়ি দিয়ে আর্মি জিপের পেছনে বেঁধে নিয়ে যায় এবং পথেই তিনি শহীদ হন। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ মে। পরে অনেক খোঁজ করেও আমরা বাবার লাশের কোনো সন্ধান পাইনি।

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাবা মিথ্যা বলেননি। সত্য বলার পরিণাম তিনি জানতেন; কিন্তু তারপরও পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছে নিজের পরিচয় গোপন করেননি। বরং পথ আগলে দাঁড়ানো পাকিস্তানি সেনাদের প্রশ্নের জবাবে দৃঢ়তা দেখিয়েই বলেছিলেন, যাকে তারা খুঁজছে তিনিই সেই আওয়ামী লীগ কর্মী আব্দুল জব্বার। পরিচয় পাওয়ার পর তারা বাবাকে আমার দাদির সামনে থেকে তুলে নিয়ে যায়। বাবাকে অকথ্য নির্যাতনের পর দড়ি দিয়ে আর্মি জিপের পেছনে বেঁধে নিয়ে যায় এবং পথেই তিনি শহীদ হন। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ মে। পরে অনেক খোঁজ করেও আমরা বাবার লাশের কোনো সন্ধান পাইনি।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ- সব ক্ষেত্রে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ব্যক্তিত্ব আর নেতৃত্বগুণে সব লড়াই-সংগ্রামে তিনি শত শত মানুষকে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর এসব কারণেই তিনি পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন।

অ্যাডভোকেট আব্দুল জব্বার

১৯২৬ সালে বগুড়া জেলার অধীন জয়পুরহাট মহকুমা (বর্তমানে জেলা) সদরের চরবকতপুর ইউনিয়নের মল্লিকপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া আব্দুল জব্বার ১৯৪৪ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএসসি (উচ্চ মাধ্যমিক) এবং রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবিতে ভর্তি হয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। ওই সময় তিনি 'দৈনিক আজাদ' এবং 'সাপ্তাহিক মিল্লাত' পত্রিকায় কাজ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই আব্দুল জব্বার ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। সেই আন্দোলনে অংশ নেওয়া গাজীউল হক তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।

এলএলবি পাস করার পর বাবা বগুড়ায় ফিরে এসে আইন পেশায় যুক্ত হন। অল্পদিনেই পেশাগত সুনাম অর্জনের কারণে তাকে পাবলিক প্রসিকিউটর এবং গভর্নমেন্ট প্লিডার (জিপি) নিযুক্ত করা হয়। পরে বগুড়ায় আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। আওয়ামী লীগের প্রতিটি সভা-সমাবেশে তিনি অংশ নিতেন।

১৯৭১-এর এপ্রিলের শেষ দিকে পাকিস্তানি বাহিনী বগুড়া শহরে ঢুকে পড়লে বাবা গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটের মল্লিকপুরে চলে যান। সেখানেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এর পাশাপাশি ভারতের বালুরঘাটে আশ্রয় শিবিরে খোঁজ-খবর নিতে তিনি গোপনে সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তার কথা জয়পুরহাটের শান্তি কমিটির লোকজন জেনে যায়। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালের ১৬ মে মল্লিকপুর গ্রামে ঢোকে। পাকিস্তানি সেনাদের উপস্থিতিতে গ্রামের লোকজন পালাতে থাকে। বাবা আমার বৃদ্ধ দাদিকে নিয়ে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে বের হওয়া মাত্র সেনাদের সামনে পড়ে যান। একজন তাকে জিজ্ঞেস করে 'তোমহারা নাম কেয়া? কেয়া করতা? কোউন পার্টি করতা?' সত্যবাদী আমার বাবা অপকটে বলেন, 'আমি আব্দুল জব্বার, ওকালতি করি এবং আওয়ামী লীগের একজন কর্মী।' এ কথা শোনার পর দাদির সামনেই তার ওপর শুরু হয় নির্যাতন। পরে তাকে দড়ি দিয়ে জিপের সঙ্গে বেঁধে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

লেখক : অ্যাডভোকেট আব্দুল জব্বারের ছোট ছেলে।

অনুলিখন : মোহন আখন্দ, ব্যুরোপ্রধান, বগুড়া

আরও পড়ুন

×