বিশেষ লেখা
ধর্ষণ থামাবে কে
কাবেরী গায়েন
প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:৫২ | আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০২০ | ১৬:০৩
বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। এটা যে কখনও থামবে- এমন কোনো আলামত দেখতে পাই না। যখন এসব ঘটনা আমাদের গায়ে এসে পড়ে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী বা এই পর্যায়ের কেউ এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়, তখন আমরা হইচই করি। আমাদের মাঝেমধ্যেই এ ধরনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের নারীই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।
সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কুর্মিটোলায় ফের ধর্ষণের ঘটনা ঘটল। বাস থেকে নামার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই ছাত্রীকে অপহরণ করে শারীরিক নির্যাতনের পর অজ্ঞান করে ধর্ষণ করা হয়েছে। এগুলো থামবে কীভাবে? আমার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। আমি অবশ্যই এ ঘটনার কঠোর শাস্তি দাবি করি। কিন্তু কার কাছে এ দাবি করব? কার শাস্তি দাবি করব? অপরাধীরা তো অজ্ঞাত। জানাশোনা অপরাধীরাই পার পেয়ে যায়! তনু ধর্ষণ ও হত্যাকারীদের কী বিচার হলো?
নারীদের রাস্তায় চলাচলে কোনো নিরাপত্তা নেই। সন্ধ্যা ৭টার দিকে একটা মেয়ে বাস থেকে নামার পর তাকে অপহরণ করে যদি ধর্ষণ করতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে- আমাদের দেশে রাস্তাঘাটে তারা কতটা অনিরাপদ। নারীদের জন্য নিরাপদ শহর ও নিরাপদ রাস্তার দাবি আজকের নয়। আমরা যখন শিক্ষার্থী ছিলাম তখন থেকেই এ দাবি করে আসছি, কিন্তু কোনো সমাধান পাইনি। আমার মনে হয়, আমরা সরকারকে সম্ভবত বোঝাতে পারিনি- এভাবে চলতে পারে না।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলা দায়ের হয়েছে। মামলার পরিণতি কী হবে, সেটা আমরা জানি। এ মামলার কোনো রায় আমরা পাব বলে আশা করি না। কারণ জ্ঞাত অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করেই ফল পাওয়া যায় না। মামলা করে ভুক্তভোগীকে প্রমাণ করতে হয়- ওই লোক তাকে ধর্ষণ করেছে। আদালতে যেভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, সেখানেও মধ্যযুগীয় মূল্যবোধের মানদণ্ডে চড়ানো হয় নারীকে. চেষ্টা থাকে তাকে 'অসতী' প্রমাণের। এ অবস্থায় অজ্ঞাত আসামিদের বিচার হবে কী করে? আমাদের দেশে যদি ধর্ষণ মামলাগুলোতে দৃটান্তমূলক শাস্তি হতো, তাহলে এভাবে ধর্ষণ বাড়ত না। দ্বিতীয়ত, সন্ধ্যা ৭টায় মেয়েটিকে অপহরণ করে শারীরিক নির্যাতনের পর ধর্ষণ করা হয়েছে। ঢাকা শহরের মতো ব্যস্ত নগরীতে সন্ধ্যা ৭টায় একটি হাসপাতালের পাশে এ ঘটনা ঘটল। এর অর্থ, আমাদের রাষ্ট্র নিরাপদ নয়, এখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নেই। যে কেউ যে কোনো সময় যে কোনো কিছু করে ফেলতে পারে। তৃতীয়ত, অপরাধীদের আসলেই খুঁজে বের করা সম্ভব হবে কি? কোনো ব্যবস্থা কি আছে?
ফলে, প্রথমত আমি মেয়েটির সুস্থতা কামনা করছি। দ্বিতীয়ত, ওই এলাকায় কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি রাখছি। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- কে তাদের জবাবদিহিতে আনবে? এখন কোথাও যদি সিসিটিভির ফুটেজ থেকে থাকে তাহলে কিছু হতে পারে। এ ছাড়া আর কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না। কাজেই এই শহরকে নিরাপদ করার জন্য রাস্তাঘাট, অলি-গলি; সব জায়গায় সিসিটিভি রাখা হোক। যেন এ ধরনের অপরাধের কিছু দৃশ্যমান আলামত থাকে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করতে হলে মানসিকতার পরিবর্তন করা দরকার। কিন্তু রাষ্ট্র সেটা চাইছে কি-না, বোঝার উপায় দেখি না।
আমাদের সমাজ ব্যবস্থার প্রত্যেকটি স্তরে এখনও পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বিচারভঙ্গি এত নিরঙ্কুশ যে, ধর্ষণের মতো ঘটনাকে নারীর কলঙ্ক হিসেবে চালিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। ফলে ধর্ষণে যৌনতার ব্যাপার যত না থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি থাকে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দম্ভ। একজন নারীকে ধর্ষণ করে যদি নিরাপদে থাকা যায়, যদি বিচার না হয়; তাহলে তো ধর্ষকরা বেপরোয়া হবেই। আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলে ধর্ষণ সম্পর্কে আলোচনা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে- ধর্ষণ কেন হচ্ছে? তাহলে কি সমাজের মধ্যে সবাই ধর্ষক? একজন নারীকে একা দেখলেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া যায়? তাহলে রাষ্ট্র্র কি কোনো না কোনোভাবে এ দৃষ্টিভঙ্গিকে বৈধতা দিচ্ছে? সমাজের মধ্যে কি এর কোনো বৈধতা আছে? অনেক আদিবাসী সমাজে কিন্তু ধর্ষণের কোনো ঘটনা নেই। আমাদের সমাজে আমরা কী শেখাচ্ছি? নারী কোমল ও অনিরাপদ; তাই বাইরে যেতে পারবে না। মেয়েরা এই পোশাক পরল কেন, এখানে-সেখানে গেল কেন- এ ধরনের মানসিকতা বহাল রয়েছে আজও। কাজেই ধর্ষণ প্রতিরোধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নারীরা যে ভোগ্যপণ্য নয়; তাদেরকে দেখলেই যে ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে না- এই মানসিকতা তৈরিতে কাজ করা জরুরি। মানসিকতা তৈরিতে রাষ্ট্রকে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে মিডিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র তো আজ পর্যন্ত ধর্ষণবিরোধী কোনো বার্তাই দিতে পারেনি; জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে মাঠে নামা তো দূরের কথা। আরও দূরের কল্পনা হলো ধর্ষণবিরোধী মানসিকতা নির্মাণে মাঠে নামা। তাই খেদ-ক্ষোভ-বেদনা যাই থাক, যে বিন্দুতে এসে সব প্রশ্ন থেমে যায় তা হলো- ধর্ষণ থামাবে কে? কে নেবে দায়? দায় নিলে না ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উঠবে! আমার দেশ সে পর্যন্ত ভাবনার অবকাশ আজ অবধি করে উঠতে পারেনি। ধর্ষণের মিছিল তাই দীর্ঘতর হচ্ছে।
অধ্যাপক; চেয়ারপারসন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- বিশেষ লেখা
- ধর্ষণ
- কাবেরী গায়েন
